ট্রাম্প শিবিরের মুখ মার্কো রুবিওর ভারত সফরে কূটনীতি, জ্বালানি ও কোয়াড রাজনীতির নতুন সমীকরণ

মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিওর কলকাতা সফর শুধু সৌজন্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ নয়। কোয়াড, জ্বালানি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও ভারত-আমেরিকা কৌশলগত সম্পর্কের নতুন সমীকরণই উঠে এল তাঁর সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে।

ট্রাম্প শিবিরের মুখ মার্কো রুবিওর ভারত সফরে কূটনীতি, জ্বালানি ও কোয়াড রাজনীতির নতুন সমীকরণ


উদয় বাংলা : মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও-র কলকাতা সফর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে তাঁর ভারত সফর নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ক্রমশ প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের কেন্দ্রে উঠে আসছে। কলকাতা পর্ব শেষ করে শনিবারই তিনি দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কথা রয়েছে।



রুবিওর এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট। একদিকে দক্ষিণ চিন সাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী অবস্থান, অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা— এই দুই পরিস্থিতির মাঝখানে ভারতকে আরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পেতে চাইছে ওয়াশিংটন। সেই কারণেই সফরের শুরুতেই মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্গিও গর স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আলোচনার কেন্দ্রে থাকছে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও কোয়াড।

কলকাতাকে সফরের সূচনা হিসেবে বেছে নেওয়ার মধ্যেও রয়েছে একটি বার্তা। দীর্ঘ ১৪ বছর পর কোনও মার্কিন বিদেশ সচিবের কলকাতা সফর নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে ২০১২ সালে তৎকালীন মার্কিন বিদেশ সচিব হিলারি ক্লিন্টন শহরে এসেছিলেন। পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বকে সামনে রেখে এই সফর ভারতের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহল।


কলকাতায় এসে রুবিওর মিসনারিজ অফ চ‌্যারিটির সদর দপ্তর মাদার হাউস পরিদর্শনও শুধুমাত্র মানবিক সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেকই মনে করছেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘সফট পাওয়ার’-এর গুরুত্ব এখন অনেক বেশি। মাদার টেরেসার মানবিক উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে কলকাতার সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিচিতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন তিনি। শিশুদের আশ্রম পরিদর্শন এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের আধিকারিকদের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তাও সেই বার্তাকেই জোরদার করেছে।

তবে সফরের মূল রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে জ্বালানি ও কোয়াড রাজনীতিতে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তার আবহে আমেরিকা চাইছে ভারতের কাছে নিজেদের জ্বালানি রফতানি আরও বাড়াতে। রুবিওর মন্তব্য— “ভারত যতটা জ্বালানি কিনতে চাইবে, আমরা ততটাই বিক্রি করতে চাই”— আসলে সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বার্তারই বহিঃপ্রকাশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি উৎপাদক ও রফতানিকারক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে কাজে লাগাতে চাইছে।

এর পাশাপাশি কোয়াড বৈঠকও এই সফরের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ২৬ মে নির্ধারিত বৈঠকে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, অস্ট্রেলিয়ার বিদেশমন্ত্রী পেনি ওওং এবং জাপানের বিদেশমন্ত্রী তসিমিত্‌শু মটেগির সঙ্গে রুবিওর আলোচনা হওয়ার কথা। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা, সমুদ্রপথে যোগাযোগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় কোয়াডকে আরও সক্রিয় করার দিকেই জোর দেওয়া হবে বলে মনে করা হচ্ছে।



রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রুবিওর সফর আসলে আমেরিকার ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অগ্রাধিকারেরও ইঙ্গিত বহন করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ এই রিপাবলিকান নেতাকে ঘিরে আমেরিকার পরবর্তী প্রশাসনিক সমীকরণ নিয়েও জল্পনা রয়েছে। ফলে তাঁর ভারত সফরকে শুধু বর্তমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নিরিখে নয়, ভবিষ্যতের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের আলোতেও দেখা হচ্ছে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন