হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে দিল ‘খেজড়ি’

রাজস্থানি ছবি ‘খেজড়ি’ গ্রামীণ ভারতের ট্রান্সজেন্ডারদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার ও অমানবিক আচরণের কঠিন বাস্তব তুলে ধরেছে। আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসিত এই ছবি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। লিখছেন অভিনন্দন

হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলে দিল ‘খেজড়ি’



এই ২০২৬-এ দাঁড়িয়েও ভারতের বহু গ্রামীণ সমাজে হিজড়া সম্প্রদায়কে মূল সমাজের বাইরে মনে করা হয়। তাঁদের প্রতি কৌতূহল, ভয়, কুসংস্কার ও অবহেলার মিশ্র দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সম্মানের অধিকার থেকে তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হন। অনেক সময় তাঁদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়, সামাজিক অনুষ্ঠানে অপমান করা হয় বা দূরে সরিয়ে রাখা হয়। যদিও ধীরে ধীরে সচেতনতা বাড়ছে, তবুও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।



সাম্প্রতিককালে রাজস্থানী ভাষার নির্মিত একটি ছবি ‘খেজরি’ (Khejdi) নিয়ে নান মহলে আলোচনা চলছে। ছবিটি ভারতীয় গ্রামীণ সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয়, কুসংস্কার, লিঙ্গ-পরিচয় সংকট এবং সামাজিক নিষ্ঠুরতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হিসাবে উঠে এসেছে। রাজস্থানের পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিটি এমন এক হিজড়া শিশুর গল্প বলে, যাকে জন্মের পর থেকেই সমাজের চোখ থেকে লুকিয়ে রাখতে চায় তার পরিবার। কিন্তু সেই লুকিয়ে রাখা জীবনের মধ্যেই ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে মানুষের পরিচয়, স্বাধীনতা এবং মর্যাদার প্রশ্ন।

ছবির কেন্দ্রে রয়েছে খেজড়ি নামের চরিত্রটি। জন্মগতভাবে ‘ভিন্ন’ হওয়ার কারণে তাকে সমাজের সামনে আনতে ভয় পান তার বাবা। গ্রামের লোকের বিদ্রুপ, অপমান ও নির্যাতনের আশঙ্কায় শিশুটিকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়। এই গল্পটি কেবল একজন ট্রান্স ব্যক্তির জীবনসংগ্রাম নয়; এটি সেই গ্রামীণ মানসিকতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে সামাজিক সম্মানকে মানুষের অস্তিত্বের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলে দিল ‘খেজড়ি’ 1


ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর বাস্তবতা। পরিচালক কোনও রকম কৃত্রিম আবেগ তৈরি করার চেষ্টা করেননি। বরং রাজস্থানের গ্রামীণ সমাজকে যেমন দেখা যায়—রুক্ষ, রক্ষণশীল এবং বহু ক্ষেত্রে নির্মম—তেমনভাবেই তুলে ধরেছেন। গ্রামের পরিবেশ, লোকজ সংস্কৃতি, ধুলো-মাখা দৃশ্য, মানুষের আচরণ—সবকিছু মিলিয়ে ছবিটি যেন এক জীবন্ত সমাজতাত্ত্বিক দলিল হয়ে ওঠে।

ভারতীয় গ্রামীণ সমাজে এখনও হিজড়া মানুষদের প্রতি যে ভয় ও ঘৃণার সংস্কৃতি রয়েছে, ‘খেজরি’ সেটিকে সরাসরি প্রশ্ন করে। ছবিতে দেখা যায়, সমাজ যাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে দাগিয়ে দেয়, সে-ই আবার সবচেয়ে বেশি মানবিক। খেজড়ি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শেখে, মানুষের উপকার করে, ভালোবাসতে শেখে। কিন্তু সমাজ তার পরিচয় মেনে নিতে পারে না। এই দ্বিচারিতাই ছবিটির সবচেয়ে তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্য।



ছবিটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে—গ্রামীণ ভারতের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। শহুরে শিক্ষিত সমাজে লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে কিছু আলোচনা শুরু হলেও, বহু গ্রামে এখনও ‘সম্মান’ রক্ষার নামে মানুষকে লুকিয়ে রাখা, ত্যাগ করা বা নির্যাতন করা হয়। ‘খেজড়ি’ দেখায় যে সমস্যাটি কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি সামাজিক কাঠামোর সমস্যা।




অভিনয়ের দিক থেকেও ছবিটি অত্যন্ত শক্তিশালী। খেজড়ির চরিত্রে অভিনয় গভীর সংবেদনশীলতা নিয়ে করা হয়েছে। চরিত্রটির নিঃসঙ্গতা, কৌতূহল, ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত আত্মমর্যাদার লড়াই দর্শককে নাড়িয়ে দেয়। সমালোচকরাও ছবিটির আবেগঘন ও অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।

তবে ছবিটির একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক সমালোচকের মতে, এটি ট্র্যাজেডিকে এতটাই কেন্দ্রে রেখেছে যে হিজড়াদের জীবনের সম্ভাবনা বা ইতিবাচক ভবিষ্যৎকে খুব কম জায়গা দিয়েছে। অর্থাৎ, ছবিটি সমাজের নিষ্ঠুরতা দেখাতে সফল হলেও মুক্তির পথ খুব স্পষ্ট করে না।

তবু ‘খেজড়ি’ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সেইসব মানুষের গল্প বলে যাদের কথা মূলধারার ভারতীয় সিনেমা প্রায়ই এড়িয়ে যায়। রাজস্থানের আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে ছবিটি প্রমাণ করেছে যে ছোট আঞ্চলিক ছবিও বড় সামাজিক প্রশ্ন তুলতে পারে। আজ যখন ভারতীয় সিনেমায় গ্রামীণ বাস্তবতা অনেক সময় কেবল রোমান্টিক লোকসংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন ‘খেজড়ি’ সেই মুখোশ সরিয়ে সমাজের কঠিন সত্য সামনে আনে।

এই ছবির সামাজিক তাৎপর্য এখানেই—এটি দর্শককে কেবল গল্প বলছে না, বরং প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছে: ‘স্বাভাবিক’ কাকে বলে? আর সমাজের তৈরি সেই স্বাভাবিকতার সংজ্ঞার বাইরে থাকা মানুষদের প্রতি আমাদের আচরণ কতটা মানবিক?


ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ব্যাপক স্বীকৃতি ও প্রশংসা অর্জন করেছে খেজরি। ছবিটি বর্তমানে পারভিন সিংহলের মালিকানাধীন স্টেজ অ্যাপে দেখা যাচ্ছে। ছবিটি নির্মাণ, চিত্রনাট্য ও প্রযোজনা করেছে আশীষ আর্চনা ক্রিয়েশনস এবং পরিচালনা করেছেন রোহিত দ্বিবেদী। নিউ ইয়র্ক সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, টেক্সাস সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং মেক্সিকো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক মঞ্চে ছবিটির প্রিমিয়ার হয়েছে। ৪০টিরও বেশি দেশে ২০টির বেশি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে এই প্রকল্প, ফলে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত স্বাধীন চলচ্চিত্রে পরিণত হয়েছে ‘খেজড়ি’।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন