আইসক্রিমের ইতিহাস: জানেন কবে, কোথায় ও কীভাবে তৈরি হয়েছিল বিশ্বের জনপ্রিয় এই ঠান্ডা মিষ্টি?

আইসক্রিমের উৎপত্তি কোথায়? মেসোপটেমিয়া থেকে ইতালি, মুঘল দরবার থেকে আধুনিক সফট সার্ভ—জানুন আইসক্রিমের অজানা ইতিহাস, আবিষ্কার ও বিবর্তনের চমকপ্রদ গল্প। লিখছেন দেবলীনা

আইসক্রিমের ইতিহাস: জানেন কবে, কোথায় ও কীভাবে তৈরি হয়েছিল বিশ্বের জনপ্রিয় এই ঠান্ডা মিষ্টি?


গরমের দিনে এক স্কুপ আইসক্রিম যেন মুহূর্তে মন ও শরীর ঠান্ডা করে দেয়। শিশু থেকে প্রবীণ—প্রায় সকলেরই প্রিয় এই ডেজার্ট। কিন্তু যে খাবারটি আজ বিশ্বজুড়ে এত জনপ্রিয়, তার জন্ম কোথায়? কবে প্রথম তৈরি হয়েছিল আইসক্রিম? এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের বিস্ময়কর ইতিহাস।



আইসক্রিমের শুরুর গল্প খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায়। সেই সময় ধনী ও অভিজাত মানুষরা গ্রীষ্মের তাপ থেকে বাঁচতে বরফ সংরক্ষণের বিশেষ গুদাম তৈরি করতেন। প্রাচীন গ্রীসেও বরফ মিশ্রিত ঠান্ডা পানীয়ের প্রচলন ছিল। পরে রোমান সম্রাট নিরো পাহাড় থেকে বরফ এনে তার সঙ্গে মধু ও ফল মিশিয়ে খেতেন। ইতিহাসবিদদের মতে, সেটিই ছিল আধুনিক আইসক্রিমের প্রাথমিক রূপগুলির একটি।

চিনের ট্যাং রাজবংশের সময়েও বরফজাত মিষ্টি পানীয় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্যাম্ফর, দুধ এবং বরফ মিশিয়ে তৈরি সেই পানীয়কে অনেকে আধুনিক আইসক্রিমের পূর্বসূরি বলে মনে করেন। একই সময়ে আরব বিশ্বে ‘শারবত’-এর প্রচলন শুরু হয়। বরফে ঠান্ডা করা ফলের রস, চিনি ও ফুলের নির্যাস দিয়ে তৈরি এই পানীয় মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পারস্যে তৈরি হতো বরফ দেওয়া ‘ফালুদা’, আর ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সম্রাটদের দরবারে জায়গা করে নেয় কুলফি।

আইসক্রিম তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ছিল বরফের সঙ্গে লবণ মেশানোর পদ্ধতি। বরফে লবণ মেশালে তার তাপমাত্রা আরও কমে যায়। সেই ঠান্ডা পরিবেশে দুধ বা তরল মিশ্রণ রেখে নাড়তে থাকলে ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে মসৃণ ক্রিমি পদার্থ। এভাবেই আধুনিক আইসক্রিম তৈরির প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়।

১৬০০ সালের দিকে ইতালিতে ইউরোপীয় স্টাইলে আইসক্রিম জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ফ্লোরেন্স, নেপলস ও প্যারিসের অভিজাত ভোজসভায় বরফ মেশানো মিষ্টি পরিবেশন করা হতো। পরে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের রাজসভাতেও আইসক্রিম পরিবেশনের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৬৯৪ সালে নেপলসের অ্যান্টোনিও লাতিনি প্রথম দুধ-ভিত্তিক আইসক্রিমের রেসিপি লিখে রাখেন বলে জানা যায়।

এরপর ইউরোপ থেকে আইসক্রিম পৌঁছে যায় আমেরিকায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন নিজের বাড়িতে আইসক্রিম তৈরির যন্ত্র বসিয়েছিলেন। টমাস জেফারসন ফরাসি ভ্যানিলা আইসক্রিমের স্বাদে মুগ্ধ হয়ে সেই রেসিপি আমেরিকায় জনপ্রিয় করে তোলেন।

সময়ের সঙ্গে পাল্টাতে থাকে আইসক্রিমের ধরন ও পরিবেশন পদ্ধতি। ১৮৭৪ সালে তৈরি হয় আইসক্রিম সোডা। ১৮৮১ সালে আসে জনপ্রিয় ‘সানডে’। ১৯০৪ সালে সেন্ট লুইস ওয়ার্ল্ড ফেয়ারে প্রথম পরিচিতি পায় ওয়াফল কন। এরপর পপসিকল, সফট সার্ভ এবং ফ্রোজেন ইয়োগার্ট ধীরে ধীরে আইসক্রিম শিল্পকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।



আজ আইসক্রিম শুধু একটি খাবার নয়, এটি বিশ্বজুড়ে আনন্দ ও উদযাপনের প্রতীক। নতুন নতুন ফ্লেভার, প্রযুক্তি ও পরিবেশনের ধরন আইসক্রিমকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। ইতিহাস বলছে, মানুষ যখন থেকেই ঠান্ডা ও মিষ্টি খাবারের সন্ধান শুরু করেছে, তখন থেকেই আইসক্রিমের যাত্রা। তাই পরের বার এক স্কুপ আইসক্রিম মুখে দেওয়ার আগে মনে রাখবেন—আপনি আস্বাদন করছেন হাজার বছরের ঐতিহ্যের এক মিষ্টি ইতিহাস।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন