রাষ্ট্রপতি মুর্মুর সফরে প্রোটোকল বিতর্ক, কেন্দ্রকে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর রাজ্য সফরে প্রোটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগের জেরে কেন্দ্রকে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠাল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতির কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মুর্মুর সফরে প্রোটোকল বিতর্ক, কেন্দ্রকে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার

উদয় বাংলা :
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সাম্প্রতিক রাজ্য সফরে প্রোটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই রিপোর্টে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ‌্যায় উপস্থিত থাকতে পারেননি, তার ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে এই বিষয়টি রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার বিকেলে রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহনের কাছে এই রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। রিপোর্টের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির উত্তরবঙ্গ সফর সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি এবং সফরের সময় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির পূর্ণ বিবরণও পাঠানো হয়েছে। সংবাদ সংস্থাকে এক রাজ্য প্রশাসনিক আধিকারিক জানিয়েছেন, পুরো ঘটনার ক্রম এবং প্রশাসনের প্রতিটি পর্যায়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের নথি-সহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে কেন মুখ্যমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে আয়োজিত ওই নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি।

এছাড়াও রাষ্ট্রপতি মুর্মুর সফরের সময় আন্তর্জাতিক আদিবাসী ও সাঁওতাল সম্মেলনের স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়েও কেন্দ্রকে অবহিত করেছে রাজ্য সরকার। অনুষ্ঠানের স্থান পরিবর্তন নিয়ে রাষ্ট্রপতি প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার পর থেকেই বিষয়টি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।

উল্লেখ্য, ৭ মার্চ রাষ্ট্রপতির রাজ্য সফরের পর প্রোটোকল ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। এর পরেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, যার দায়িত্বে রয়েছেন অমিত শাহর দপ্তর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে এ বিষয়ে রিপোর্ট চায়। রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধিদের ওই অনুষ্ঠানে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি সম্মেলনের স্থান হঠাৎ বদলানোর বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন এবং অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতি নিয়ে হতাশাও প্রকাশ করেন।

রাষ্ট্রপতির মন্তব্য, বিশেষ করে ‘মমতাদি আমার ছোট বোন, জানি না আমার উপর কী রাগ’—রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী দলগুলির মধ্যে শুরু হয় তীব্র রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা।

এই বিতর্কের জবাবে কলকাতার এক প্রতিবাদ মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে যে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল সে সম্পর্কে তাঁকে আগাম জানানো হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতির রাজ্য সফরের কথা জানতেন ঠিকই, কিন্তু ওই নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের আয়োজক কারা এবং কী উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়েছে সে বিষয়ে তাঁর কোনও ধারণা ছিল না বলেই দাবি করেন তিনি।

পরিস্থিতি আরও তীব্র হয় যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সমাজমাধ্যমে এই ইস্যু নিয়ে মন্তব্য করেন এবং পরে প্রকাশ্যেও রাজ্য সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্রপতিকে অসম্মান করা হয়েছে। এতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রোটোকল ভঙ্গের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের তরফে কোনও প্রোটোকল লঙ্ঘন করা হয়নি। রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানানো এবং বিদায় জানানোর সময় কারা উপস্থিত থাকবেন, সেই তালিকা আগে থেকেই চূড়ান্ত করা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকেই তা অনুমোদিত ছিল। সেই তালিকায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম ছিল না বলেও তিনি দাবি করেন।

নবান্ন সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, কেন্দ্রকে পাঠানো রিপোর্টে রাষ্ট্রপতির সফরের সময় মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজির অনুপস্থিতি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তারও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক রাজ্যকে পাঠানো চিঠিতে ‘ব্লু বুক’ নিয়ম ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগ তুলেছিল। এই ‘ব্লু বুক’ হল একটি গোপন নথি, যেখানে রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও প্রোটোকল সংক্রান্ত নিয়মাবলি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকে। রাজ্য সরকারের তরফে পাঠানো রিপোর্টে এই সমস্ত বিষয়েই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন