খারাটের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের আটটি এবং প্রতারণার দুটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়াও, আরও প্রায় ১৫০ জন ফোন করে এসআইটিকে খারটের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে।
উদয় বাংলা ডেস্ক : মার্চ মাসের মাঝামাঝি এক সন্ধ্যা। নাসিকের গণেশওয়াড়ি থানায় এলেন এক বছর পঁত্রিশের মহিলা। সরাসরি থানার বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করে বললেন, একটি এফআইআর দায়ের করতে চান। কার বিরুদ্ধে? মহিলা নামটি উচ্চারনের সঙ্গে সঙ্গে থানার বড়বাবুর পায়ের তলার মাটি যেন কেঁপে ওঠে।কারণ, অভিযুক্ত আর কেউ নন, তিনি এক প্রভাবশালী জ্যোতিষী। নিজেকে জ্যোতিষসম্রাট বলে পরিচয় দেন। পারিবারিক সমস্যা, কার্যে বাধা, ব্যবসায় গোলযোগ, গোপন শত্রু– এ সব মিটিয়ে ফেলা তাঁর কাছে নস্যি। রাজনীতি ও প্রশাসনের উপর মহলেও তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি। তাঁর গুনমুগ্ধদের মধ্যে আছেন অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায় ও নেতামন্ত্রী।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান অফিসার। এফআইআর লেখার আগে আগন্তুক মহিলাকে প্রশ্ন করেন, তিনি কোনও ভুল করছেন না তো? প্রয়োজনে তিনি আরও একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে নিতে পারেন। কারণ, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে তাঁকে বিচারের কাঠগোড়ায় নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু, মহিলা নাছোড়। তিনি ঠিক করেই ফেলেছন যে ওই জ্যোতিষীকে তিনি বিচারের মুখোমুখী দাঁড় করাবেনই। অনেক চুপ করে থেকেছেন। তাঁর যে ক্ষতি হয়েছে তা যাতে আরও কারও সঙ্গে না ঘটে সেই ব্যবস্থা তাঁকে করতেই হবে।
বাধ্য হয়েই মহিলা পুলিশ অফিসারকে ডেকে এফআইআর লেখানো হয়।মহিলা অভিযোগ করেন, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালে। তখন তাঁর একটি বিবাহের যোগাযোগ আসে। সব ঠিক আছে কিনা গণনা করতে তিনি এক আত্মীয়র সঙ্গে গিয়েছিলেন জ্যোতিষী অশোক খারাটের কাছে। নাসিকে তাঁর চেম্বারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা হয়েছিল আগেই। খারাটের পরামর্শে সেই সম্বন্ধ ভেঙে দেন মহিলা। এরপর করোনা অতিমারি এসে যায়। সেসব স্বাভাবিক হলে ২০২২ সালে মহিলা আবার একটি বিবাহের প্রস্তাব পান। তখন তিনি আবার খারাটের কাছে যান। খারাট তাঁকে একটি লকেট দেন এবং বলে দেন সেটি খুলে রাখলে সম্পর্ক ভেঙে যাবে। তবে, মহিলা ওই লকেট খুলে রাখার পর কোনও কারণে সত্যিই সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। তাতে খারটের জ্যোতিষ ও তন্ত্রক্ষমতার প্রতি মহিলার বিশ্বাস আরও গভীর হয়।
খারাট তখন নিজেকে ঈশ্বরের অবতার বলে দাবি করে ‘পূজার্চনার’-এর নামে মহিলাকে বারবার অফিসে ডাকতে থাকেন। সেখানে তিনি নেশাজাতীয় দ্রব্য মেশানো পানীয় খাইয়ে প্রায় সম্মোহিত করে ফেলতেন, মন্ত্র-তন্ত্রের আড়ালে যৌন নির্যাতন চালাতেন। আপত্তি করলে ভয় দেখাতেন—‘ আমার কথা না মানলে তোমার স্বামী মারা যাবে, পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে। এই নির্যাতন চলতে থাকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। মহিলা বিয়ের পরেও খারাটের ভয়ে চুপ করে ছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত সাহস করে পুলিশের দ্বারস্থ হন।
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই যেন বোমা ফাটে। ১৮-১৯ মার্চ ২০২৬-এ গ্রেপ্তারের পরই খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং মহারাষ্ট্র জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রাজ্য সরকার তৎক্ষণাৎ এসআইটি গঠন করে, যার নেতৃত্বে আইপিএস অফিসার তেজস্বিনী সাতপুতে। তার আগে নাসিক ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইউনিট-১ তদন্তভার নেয় এবং খারাটের অফিস, ফার্মহাউস, মিরগাঁওয়ের মন্দির ও অন্যান্য জায়গায় একযোগে তল্লাশি চালায়। ক্রমে খারাটের কুকির্তী ফাঁস হতে থাকে। এতদিন যে সব মহিলা খারাটের নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করতে বাধ্য হয়েছে, তাঁদের অনেকেই সরাসরি অভিযোগ জানাতে শুরু করে।
কে এই ‘জ্যোতিষাচার্য’ অশোক খারাট?
নাসিকের কানাডা কর্নার এলাকায় ওকাস প্রপার্টি ডিলার্স অ্যান্ড ডেভেলপার্স নামের একটি অফিসকে সামনে রেখে নিজেকে ‘ক্যাপ্টেন’ বলে পরিচয় দিতেন অশোক খারাট। তিনি আসলে ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত মার্চেন্ট নেভির অফিসার। যিনি ২২ বছর সমুদ্রে কাটিয়ে দেশে ফিরে জ্যোতিষ ও নিউমেরোলজির নামে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। ৬৭ বছর বয়সী অশোক খারাট নিজেকে কসমোলজির বিশেষজ্ঞ বলে দাবি করতেন। শিন্নার তালুকার কাহান্দালওয়াড়ি গ্রাম থেকে উঠে এসে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সেলিব্রিটি ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে এমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে তাঁর একটি পরামর্শের জন্য লাখ লাখ টাকা চার্জ করতেন—কখনও কখনও ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ১০০-২০০ কোটি টাকারও বেশি বলে অনুমান করছেন তদন্তকারীরা, যার মধ্যে নাসিকের বিভিন্ন এলাকায় জমি, বাড়ি ও শিরডিতে বিনিয়োগ রয়েছে। শ্রী ঈশানেশ্বর মহাদেব মন্দির ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি ধর্মীয় খোলসে নিজেকে মুড়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এই চকচকে বাহ্যিক চেহারার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর প্রতারণা ও যৌন লিপ্সার জাল, যা শেষ পর্যন্ত একজন মহিলার সাহসে প্রকাশ্যে এসে পড়ে।
২৭ মার্চ রাতে সরকারওয়াড়া থানায় দায়ের হওয়া আরেকটি অভিযোগের ভিত্তিতে অশোক খারাটের বিরুদ্ধে অষ্টম ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি চারবার ভুক্তভোগীকে ধর্ষণ করেন। খারাট ভুক্তভোগীকে নেশাদ্রব্য মিশ্রিত জল পান করান। এরপর ‘আমি মহাদেবের অবতার’ বলে দাবি করে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চারবার ধর্ষণ করেন—এমনটাই অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। খারাটের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের আটটি এবং প্রতারণার দুটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়াও, আরও প্রায় ১৫০ জন ফোন করে এসআইটিকে খারটের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে।
শুধু মহিলাদের সঙ্গে যৌনতাই নয়, ধনী ব্যবসায়ীদের ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা লুঠে নিয়েছেন এই ভণ্ড জ্যোতিষী। নেভাসার বাসিন্দা রাজেন্দ্র নানাসাহেব ভাগবত নামে এক কাপড় ব্যবসায়ী সরকারওয়াড়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁকে প্রতারণা করেন। ব্যবসার উন্নতির জন্য মন্ত্রপূত পুষ্করাজ ও হীরা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। মোট ২ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা নগদ এবং ২০ গ্রাম ওজনের তিনটি সোনার আঙটির বিনিময়ে দুটি মন্ত্রপূত আংটি দিয়েছিল খারাট। তার গ্রেপ্তারের খবর জানার পর সন্দেহবশত ভাগবত আংটিগুলি পরীক্ষা করাতে যান ব্যবসায়ী। দেখেন, সেগুলি আসলে হলুদ ধাতুর (তামা) তৈরি এবং তাতে বসানো পাথরও নকল।
পুলিশী তল্লাশিতে যা বেরিয়ে আসে তা ছিল চোখ ধাঁধানো। অফিসের ভিতরে গোপন সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো ছিল, যাতে মহিলাদের আপত্তিকর ছবি গোপনে রেকর্ড করা হত। পুলিশ একটি পেন ড্রাইভ উদ্ধার করে, যাতে ৫৮ জন মহিলার সঙ্গে অশ্লীল কাজের ভিডিও ছিল। এই ভিডিওগুলোতে খারাটের ‘রিচুয়াল’-এর নামে নেশাজাতীয় পানীয় খাওয়ানো, ভয় দেখানো এবং যৌন নির্যাতনের প্রমাণ স্পষ্ট। তদন্তে জানা যায়, খারাট নকল সাপ (রিমোট কন্ট্রোলযুক্ত), টাইগার স্কিনের কাপড়, জন্তু-জানোয়ারের চামড়া ও অন্যান্য প্রপস ব্যবহার করে ক্লায়েন্টদের ভয় দেখাতেন—যাতে তারা বিশ্বাস করত যে তাঁর ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ আছে বা ‘কালো জাদু’র হুমকি সত্যি। সস্তা জংলি চিনচের বীজ পালিশ করে ‘এনার্জাইজড স্টোন’ বলে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করতেন। কস্তুরী, জড়িবুটি, নকল রত্ন—সবই ছিল প্রতারণার অংশ। তাঁর অফিস বয় নীরজ জাধবের কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়; তিনি খারাটের অপকর্মের কিছু প্রমাণ পুলিশকে দিয়েছিলেন বলে জানা যায় এবং পরে তাঁকে পুলিশি সুরক্ষা দেওয়া হয়। পুলিশ খারাটের বাড়ি থেকে লাইসেন্সড পিস্তল, গুলি ও নথিপত্রও উদ্ধার করে।
খারাটের রাজনৈতিক যোগাযোগও সামনে আসে—প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে তাঁর মন্দির পরিদর্শন করেছিলেন, মহারাষ্ট্র স্টেট উইমেন্স কমিশনের চেয়ারপার্সন রূপালী চাকণকর তাঁর পা ধুয়ে দিয়েছিলেন বলে ভাইরাল ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। খারাটের স্ত্রী কল্পনা বলেন, তাঁর স্বামী আসলে জ্যোতিষী ছিলেন না, ঘনিষ্ঠজনেরাই তাঁকে ফাঁসিয়েছে। কিন্তু প্রমাণের সামনে সব অজুহাত ধুলোয় মিশে যায়।
উদয় বাংলা ডেস্ক : মার্চ মাসের মাঝামাঝি এক সন্ধ্যা। নাসিকের গণেশওয়াড়ি থানায় এলেন এক বছর পঁত্রিশের মহিলা। সরাসরি থানার বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করে বললেন, একটি এফআইআর দায়ের করতে চান। কার বিরুদ্ধে? মহিলা নামটি উচ্চারনের সঙ্গে সঙ্গে থানার বড়বাবুর পায়ের তলার মাটি যেন কেঁপে ওঠে।কারণ, অভিযুক্ত আর কেউ নন, তিনি এক প্রভাবশালী জ্যোতিষী। নিজেকে জ্যোতিষসম্রাট বলে পরিচয় দেন। পারিবারিক সমস্যা, কার্যে বাধা, ব্যবসায় গোলযোগ, গোপন শত্রু– এ সব মিটিয়ে ফেলা তাঁর কাছে নস্যি। রাজনীতি ও প্রশাসনের উপর মহলেও তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি। তাঁর গুনমুগ্ধদের মধ্যে আছেন অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায় ও নেতামন্ত্রী।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান অফিসার। এফআইআর লেখার আগে আগন্তুক মহিলাকে প্রশ্ন করেন, তিনি কোনও ভুল করছেন না তো? প্রয়োজনে তিনি আরও একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে নিতে পারেন। কারণ, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে তাঁকে বিচারের কাঠগোড়ায় নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু, মহিলা নাছোড়। তিনি ঠিক করেই ফেলেছন যে ওই জ্যোতিষীকে তিনি বিচারের মুখোমুখী দাঁড় করাবেনই। অনেক চুপ করে থেকেছেন। তাঁর যে ক্ষতি হয়েছে তা যাতে আরও কারও সঙ্গে না ঘটে সেই ব্যবস্থা তাঁকে করতেই হবে।
বাধ্য হয়েই মহিলা পুলিশ অফিসারকে ডেকে এফআইআর লেখানো হয়।মহিলা অভিযোগ করেন, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালে। তখন তাঁর একটি বিবাহের যোগাযোগ আসে। সব ঠিক আছে কিনা গণনা করতে তিনি এক আত্মীয়র সঙ্গে গিয়েছিলেন জ্যোতিষী অশোক খারাটের কাছে। নাসিকে তাঁর চেম্বারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা হয়েছিল আগেই। খারাটের পরামর্শে সেই সম্বন্ধ ভেঙে দেন মহিলা। এরপর করোনা অতিমারি এসে যায়। সেসব স্বাভাবিক হলে ২০২২ সালে মহিলা আবার একটি বিবাহের প্রস্তাব পান। তখন তিনি আবার খারাটের কাছে যান। খারাট তাঁকে একটি লকেট দেন এবং বলে দেন সেটি খুলে রাখলে সম্পর্ক ভেঙে যাবে। তবে, মহিলা ওই লকেট খুলে রাখার পর কোনও কারণে সত্যিই সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। তাতে খারটের জ্যোতিষ ও তন্ত্রক্ষমতার প্রতি মহিলার বিশ্বাস আরও গভীর হয়।
খারাট তখন নিজেকে ঈশ্বরের অবতার বলে দাবি করে ‘পূজার্চনার’-এর নামে মহিলাকে বারবার অফিসে ডাকতে থাকেন। সেখানে তিনি নেশাজাতীয় দ্রব্য মেশানো পানীয় খাইয়ে প্রায় সম্মোহিত করে ফেলতেন, মন্ত্র-তন্ত্রের আড়ালে যৌন নির্যাতন চালাতেন। আপত্তি করলে ভয় দেখাতেন—‘ আমার কথা না মানলে তোমার স্বামী মারা যাবে, পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে। এই নির্যাতন চলতে থাকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। মহিলা বিয়ের পরেও খারাটের ভয়ে চুপ করে ছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত সাহস করে পুলিশের দ্বারস্থ হন।
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই যেন বোমা ফাটে। ১৮-১৯ মার্চ ২০২৬-এ গ্রেপ্তারের পরই খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং মহারাষ্ট্র জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রাজ্য সরকার তৎক্ষণাৎ এসআইটি গঠন করে, যার নেতৃত্বে আইপিএস অফিসার তেজস্বিনী সাতপুতে। তার আগে নাসিক ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইউনিট-১ তদন্তভার নেয় এবং খারাটের অফিস, ফার্মহাউস, মিরগাঁওয়ের মন্দির ও অন্যান্য জায়গায় একযোগে তল্লাশি চালায়। ক্রমে খারাটের কুকির্তী ফাঁস হতে থাকে। এতদিন যে সব মহিলা খারাটের নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করতে বাধ্য হয়েছে, তাঁদের অনেকেই সরাসরি অভিযোগ জানাতে শুরু করে।
কে এই ‘জ্যোতিষাচার্য’ অশোক খারাট?
নাসিকের কানাডা কর্নার এলাকায় ওকাস প্রপার্টি ডিলার্স অ্যান্ড ডেভেলপার্স নামের একটি অফিসকে সামনে রেখে নিজেকে ‘ক্যাপ্টেন’ বলে পরিচয় দিতেন অশোক খারাট। তিনি আসলে ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত মার্চেন্ট নেভির অফিসার। যিনি ২২ বছর সমুদ্রে কাটিয়ে দেশে ফিরে জ্যোতিষ ও নিউমেরোলজির নামে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। ৬৭ বছর বয়সী অশোক খারাট নিজেকে কসমোলজির বিশেষজ্ঞ বলে দাবি করতেন। শিন্নার তালুকার কাহান্দালওয়াড়ি গ্রাম থেকে উঠে এসে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সেলিব্রিটি ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে এমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে তাঁর একটি পরামর্শের জন্য লাখ লাখ টাকা চার্জ করতেন—কখনও কখনও ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ১০০-২০০ কোটি টাকারও বেশি বলে অনুমান করছেন তদন্তকারীরা, যার মধ্যে নাসিকের বিভিন্ন এলাকায় জমি, বাড়ি ও শিরডিতে বিনিয়োগ রয়েছে। শ্রী ঈশানেশ্বর মহাদেব মন্দির ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি ধর্মীয় খোলসে নিজেকে মুড়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এই চকচকে বাহ্যিক চেহারার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর প্রতারণা ও যৌন লিপ্সার জাল, যা শেষ পর্যন্ত একজন মহিলার সাহসে প্রকাশ্যে এসে পড়ে।
২৭ মার্চ রাতে সরকারওয়াড়া থানায় দায়ের হওয়া আরেকটি অভিযোগের ভিত্তিতে অশোক খারাটের বিরুদ্ধে অষ্টম ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি চারবার ভুক্তভোগীকে ধর্ষণ করেন। খারাট ভুক্তভোগীকে নেশাদ্রব্য মিশ্রিত জল পান করান। এরপর ‘আমি মহাদেবের অবতার’ বলে দাবি করে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চারবার ধর্ষণ করেন—এমনটাই অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। খারাটের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের আটটি এবং প্রতারণার দুটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়াও, আরও প্রায় ১৫০ জন ফোন করে এসআইটিকে খারটের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে।
শুধু মহিলাদের সঙ্গে যৌনতাই নয়, ধনী ব্যবসায়ীদের ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা লুঠে নিয়েছেন এই ভণ্ড জ্যোতিষী। নেভাসার বাসিন্দা রাজেন্দ্র নানাসাহেব ভাগবত নামে এক কাপড় ব্যবসায়ী সরকারওয়াড়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁকে প্রতারণা করেন। ব্যবসার উন্নতির জন্য মন্ত্রপূত পুষ্করাজ ও হীরা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। মোট ২ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা নগদ এবং ২০ গ্রাম ওজনের তিনটি সোনার আঙটির বিনিময়ে দুটি মন্ত্রপূত আংটি দিয়েছিল খারাট। তার গ্রেপ্তারের খবর জানার পর সন্দেহবশত ভাগবত আংটিগুলি পরীক্ষা করাতে যান ব্যবসায়ী। দেখেন, সেগুলি আসলে হলুদ ধাতুর (তামা) তৈরি এবং তাতে বসানো পাথরও নকল।
পুলিশী তল্লাশিতে যা বেরিয়ে আসে তা ছিল চোখ ধাঁধানো। অফিসের ভিতরে গোপন সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো ছিল, যাতে মহিলাদের আপত্তিকর ছবি গোপনে রেকর্ড করা হত। পুলিশ একটি পেন ড্রাইভ উদ্ধার করে, যাতে ৫৮ জন মহিলার সঙ্গে অশ্লীল কাজের ভিডিও ছিল। এই ভিডিওগুলোতে খারাটের ‘রিচুয়াল’-এর নামে নেশাজাতীয় পানীয় খাওয়ানো, ভয় দেখানো এবং যৌন নির্যাতনের প্রমাণ স্পষ্ট। তদন্তে জানা যায়, খারাট নকল সাপ (রিমোট কন্ট্রোলযুক্ত), টাইগার স্কিনের কাপড়, জন্তু-জানোয়ারের চামড়া ও অন্যান্য প্রপস ব্যবহার করে ক্লায়েন্টদের ভয় দেখাতেন—যাতে তারা বিশ্বাস করত যে তাঁর ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ আছে বা ‘কালো জাদু’র হুমকি সত্যি। সস্তা জংলি চিনচের বীজ পালিশ করে ‘এনার্জাইজড স্টোন’ বলে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করতেন। কস্তুরী, জড়িবুটি, নকল রত্ন—সবই ছিল প্রতারণার অংশ। তাঁর অফিস বয় নীরজ জাধবের কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়; তিনি খারাটের অপকর্মের কিছু প্রমাণ পুলিশকে দিয়েছিলেন বলে জানা যায় এবং পরে তাঁকে পুলিশি সুরক্ষা দেওয়া হয়। পুলিশ খারাটের বাড়ি থেকে লাইসেন্সড পিস্তল, গুলি ও নথিপত্রও উদ্ধার করে।
খারাটের রাজনৈতিক যোগাযোগও সামনে আসে—প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে তাঁর মন্দির পরিদর্শন করেছিলেন, মহারাষ্ট্র স্টেট উইমেন্স কমিশনের চেয়ারপার্সন রূপালী চাকণকর তাঁর পা ধুয়ে দিয়েছিলেন বলে ভাইরাল ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। খারাটের স্ত্রী কল্পনা বলেন, তাঁর স্বামী আসলে জ্যোতিষী ছিলেন না, ঘনিষ্ঠজনেরাই তাঁকে ফাঁসিয়েছে। কিন্তু প্রমাণের সামনে সব অজুহাত ধুলোয় মিশে যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন