ভণ্ড জ্যোতিষী, স্বঘোষিত ‘গডম্যান’দের যৌন শোষণ, টাকা হাতানো ও অনলাইন প্রতারণার উদাহরণ নেহাত কম নয়। বেঙ্গালুরু, পুনে, হায়দরাবাদ, লক্ষ্ণৌ ও দিল্লির ঘটনা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তবু অন্ধবিশ্বাসে আজও বহু মানুষ তাঁদের কাছে ছুটে যান। লিখছেন ভরত সেন
নাসিকের অশোক খারাটের গ্রেপ্তারের ঘটনা যখন মহারাষ্ট্র জুড়ে আলোড়ন তুলেছে, তখন এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতে জ্যোতিষ, তন্ত্র-মন্ত্র ও আধ্যাত্মিকতার নামে চলা প্রতারণা ও যৌন শোষণের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্বলতা, ভয় ও আশাকে পুঁজি করে এই ভণ্ডরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন, নারীদের শোষণ করেন এবং কখনও কখনও প্রাণঘাতী হুমকি দিয়ে নীরবতা চাপিয়ে দেন। খারাটের মতোই অনেক ক্ষেত্রে গোপন ক্যামেরা, নেশাজাতীয় পানীয়, ভয় দেখানো এবং ‘অনুষ্ঠান’-এর নামে অপকর্ম চলে। নীচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কেলেঙ্কারির বাস্তব তথ্য তুলে ধরা হল।
একটি সাম্প্রতিক ঘটনায় বেঙ্গালুরুর এক আয়কর অফিসারকে ‘প্যারট অ্যাস্ট্রোলজার’ (তোতা জ্যোতিষী) শেখর (৫৯) প্রতারিত করেন। ২০২৫-২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত তিনি অফিসারের ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের সমস্যা দূর করার নামে বিশেষ অনুষ্ঠানের কথা বলে সোনা-রুপোর গয়না (প্রায় ৩১-৩৫ লাখ টাকার) ও নগদ টাকা হাতিয়ে নেন। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এই ধরনের ‘রোডসাইড’ জ্যোতিষীদের ফাঁদে পড়ে শিক্ষিত মানুষও সহজে বিশ্বাস করেন।
আরেকটি চাঞ্চল্যকর কেস পুনেতে ঘটে। ২০২৪ সালে এক যুবতী (২০-এর কোঠায়) অনলাইনে এক জ্যোতিষীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি দাবি করেন পরিবারে ‘কালো জাদু’র প্রভাব রয়েছে। ‘অনুষ্ঠান’-এর নামে প্রথমে লাড্ডু খাইয়ে নেশা করিয়ে অজ্ঞান করেন, পরে হলুদ তরল খাইয়ে আবার অজ্ঞান করে ছবি তুলে ব্ল্যাকমেল করেন। এভাবে ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন এবং বাড়ি থেকে গয়না চুরি করেন। পুনের স্বারগেট পুলিশ এই মামলায় তদন্ত করে।
হায়দরাবাদে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সিরিগিরি মঞ্জুনাথ (ওরফে কোয়া রাজু) নামের এক ভণ্ডকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিয়ে ‘নারদোষ’ দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা আদায় করেন। মায়ের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বিশেষ পূজা-অনুষ্ঠানের নামে টাকা নেন। পুলিশ তাঁর কাছ থেকে ১৪.৬৫ লাখ টাকা নগদ উদ্ধার করে। এই কেসে ড্রাগস অ্যান্ড ম্যাজিক রেমেডিজ অ্যাক্টও প্রয়োগ হয়।
লক্ষ্ণৌয়ে এক ব্যবসায়ী ২০২৪ সালে ‘দুষ্ট আত্মা’ দূর করার নামে এক ভণ্ড জ্যোতিষীর ফাঁদে পড়েন। প্রায় এক বছর ধরে ৬৫ লাখ টাকা পাঠান। ব্যবসায় লোকসানের পর তিনি বিষণ্ণ ছিলেন, সেই সুযোগ নিয়ে ভণ্ড তাঁকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেন।
দিল্লিতে ২০২৫ সালে এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মহিলাকে ইনস্টাগ্রামে বিজ্ঞাপন দেখে এক জ্যোতিষী (সুনিত ঝা, জয়পুরের) যোগাযোগ করেন। তিনি ‘জীবনের সমস্যা’ দূর করার নামে বারাণসীতে পূজা করিয়ে ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। দিল্লি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
বেঙ্গালুরুর আরেকটি কেসে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৪ বছরের এক যুবতী ইনস্টাগ্রামের ভুয়ো জ্যোতিষী বিজয় কুমারের ফাঁদে পড়েন। প্রেম-বিবাহের বাধা দূর করার নামে একাধিক ‘অনুষ্ঠান’-এর জন্য ৬ লাখ টাকা খরচ করেন।
এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেমন অ্যাস্ট্রোটক-এর মাধ্যমেও অনেক ভুয়ো জ্যোতিষী সক্রিয়। ফ্রি কনসালটেশনের লোভ দেখিয়ে পরে ‘রেমেডি’র নামে পেমেন্ট লিঙ্ক পাঠিয়ে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খালি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভারতের জ্যোতিষ বাজারের আকার প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা বলে অনুমান করা হয়, যা এই প্রতারণাকে আরও বড় করে তুলেছে।
অনেক ক্ষেত্রে ভণ্ডরা নিজেকে ‘কৃষ্ণের অবতার’ বা ‘শিবের অবতার’ বলে দাবি করে নারীদের ফাঁদে ফেলেন। ‘তুমি আমার রাধা’ বলে নেশা খাইয়ে যৌন নির্যাতন চালানোর অভিযোগও উঠেছে। কখনও নকল সাপ, টাইগার স্কিন বা জড়িবুটির নামে ভয় দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা হয়।
এই কেলেঙ্কারিগুলো দেখিয়ে দেয় যে, শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই এই জালে পড়ছেন। অনলাইন অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া ও টিভি বিজ্ঞাপন এই প্রতারণাকে আরও সহজ করে তুলেছে। পুলিশি তদন্ত ও কুসংস্কার-বিরোধী আইন থাকলেও অন্ধবিশ্বাসের শিকড় গভীর। খারাটের মতো কেসগুলোতে একজন ভুক্তভোগীর সাহসী অভিযোগই অনেক সময় জাল উন্মোচিত করে।
ভারতে ভণ্ড জ্যোতিষীদের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিজ্ঞানমনস্কতা, যাচাই-বাছাই এবং আইনি সহায়তা নেওয়াই একমাত্র উপায়। যতক্ষণ না মানুষ নিজের সমস্যা সমাধানে যুক্তি ও প্রচেষ্টাকে প্রাধান্য দেবেন, ততক্ষণ এই শোষণ চলতেই থাকবে।
![]() |
| AI-generated symbolic image |
নাসিকের অশোক খারাটের গ্রেপ্তারের ঘটনা যখন মহারাষ্ট্র জুড়ে আলোড়ন তুলেছে, তখন এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতে জ্যোতিষ, তন্ত্র-মন্ত্র ও আধ্যাত্মিকতার নামে চলা প্রতারণা ও যৌন শোষণের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্বলতা, ভয় ও আশাকে পুঁজি করে এই ভণ্ডরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন, নারীদের শোষণ করেন এবং কখনও কখনও প্রাণঘাতী হুমকি দিয়ে নীরবতা চাপিয়ে দেন। খারাটের মতোই অনেক ক্ষেত্রে গোপন ক্যামেরা, নেশাজাতীয় পানীয়, ভয় দেখানো এবং ‘অনুষ্ঠান’-এর নামে অপকর্ম চলে। নীচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কেলেঙ্কারির বাস্তব তথ্য তুলে ধরা হল।
একটি সাম্প্রতিক ঘটনায় বেঙ্গালুরুর এক আয়কর অফিসারকে ‘প্যারট অ্যাস্ট্রোলজার’ (তোতা জ্যোতিষী) শেখর (৫৯) প্রতারিত করেন। ২০২৫-২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত তিনি অফিসারের ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের সমস্যা দূর করার নামে বিশেষ অনুষ্ঠানের কথা বলে সোনা-রুপোর গয়না (প্রায় ৩১-৩৫ লাখ টাকার) ও নগদ টাকা হাতিয়ে নেন। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এই ধরনের ‘রোডসাইড’ জ্যোতিষীদের ফাঁদে পড়ে শিক্ষিত মানুষও সহজে বিশ্বাস করেন।
আরেকটি চাঞ্চল্যকর কেস পুনেতে ঘটে। ২০২৪ সালে এক যুবতী (২০-এর কোঠায়) অনলাইনে এক জ্যোতিষীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি দাবি করেন পরিবারে ‘কালো জাদু’র প্রভাব রয়েছে। ‘অনুষ্ঠান’-এর নামে প্রথমে লাড্ডু খাইয়ে নেশা করিয়ে অজ্ঞান করেন, পরে হলুদ তরল খাইয়ে আবার অজ্ঞান করে ছবি তুলে ব্ল্যাকমেল করেন। এভাবে ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন এবং বাড়ি থেকে গয়না চুরি করেন। পুনের স্বারগেট পুলিশ এই মামলায় তদন্ত করে।
হায়দরাবাদে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সিরিগিরি মঞ্জুনাথ (ওরফে কোয়া রাজু) নামের এক ভণ্ডকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিয়ে ‘নারদোষ’ দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা আদায় করেন। মায়ের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বিশেষ পূজা-অনুষ্ঠানের নামে টাকা নেন। পুলিশ তাঁর কাছ থেকে ১৪.৬৫ লাখ টাকা নগদ উদ্ধার করে। এই কেসে ড্রাগস অ্যান্ড ম্যাজিক রেমেডিজ অ্যাক্টও প্রয়োগ হয়।
লক্ষ্ণৌয়ে এক ব্যবসায়ী ২০২৪ সালে ‘দুষ্ট আত্মা’ দূর করার নামে এক ভণ্ড জ্যোতিষীর ফাঁদে পড়েন। প্রায় এক বছর ধরে ৬৫ লাখ টাকা পাঠান। ব্যবসায় লোকসানের পর তিনি বিষণ্ণ ছিলেন, সেই সুযোগ নিয়ে ভণ্ড তাঁকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেন।
দিল্লিতে ২০২৫ সালে এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মহিলাকে ইনস্টাগ্রামে বিজ্ঞাপন দেখে এক জ্যোতিষী (সুনিত ঝা, জয়পুরের) যোগাযোগ করেন। তিনি ‘জীবনের সমস্যা’ দূর করার নামে বারাণসীতে পূজা করিয়ে ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। দিল্লি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
বেঙ্গালুরুর আরেকটি কেসে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৪ বছরের এক যুবতী ইনস্টাগ্রামের ভুয়ো জ্যোতিষী বিজয় কুমারের ফাঁদে পড়েন। প্রেম-বিবাহের বাধা দূর করার নামে একাধিক ‘অনুষ্ঠান’-এর জন্য ৬ লাখ টাকা খরচ করেন।
এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেমন অ্যাস্ট্রোটক-এর মাধ্যমেও অনেক ভুয়ো জ্যোতিষী সক্রিয়। ফ্রি কনসালটেশনের লোভ দেখিয়ে পরে ‘রেমেডি’র নামে পেমেন্ট লিঙ্ক পাঠিয়ে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খালি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভারতের জ্যোতিষ বাজারের আকার প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা বলে অনুমান করা হয়, যা এই প্রতারণাকে আরও বড় করে তুলেছে।
অনেক ক্ষেত্রে ভণ্ডরা নিজেকে ‘কৃষ্ণের অবতার’ বা ‘শিবের অবতার’ বলে দাবি করে নারীদের ফাঁদে ফেলেন। ‘তুমি আমার রাধা’ বলে নেশা খাইয়ে যৌন নির্যাতন চালানোর অভিযোগও উঠেছে। কখনও নকল সাপ, টাইগার স্কিন বা জড়িবুটির নামে ভয় দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা হয়।
এই কেলেঙ্কারিগুলো দেখিয়ে দেয় যে, শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই এই জালে পড়ছেন। অনলাইন অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া ও টিভি বিজ্ঞাপন এই প্রতারণাকে আরও সহজ করে তুলেছে। পুলিশি তদন্ত ও কুসংস্কার-বিরোধী আইন থাকলেও অন্ধবিশ্বাসের শিকড় গভীর। খারাটের মতো কেসগুলোতে একজন ভুক্তভোগীর সাহসী অভিযোগই অনেক সময় জাল উন্মোচিত করে।
ভারতে ভণ্ড জ্যোতিষীদের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিজ্ঞানমনস্কতা, যাচাই-বাছাই এবং আইনি সহায়তা নেওয়াই একমাত্র উপায়। যতক্ষণ না মানুষ নিজের সমস্যা সমাধানে যুক্তি ও প্রচেষ্টাকে প্রাধান্য দেবেন, ততক্ষণ এই শোষণ চলতেই থাকবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন