ভবানীপুরে শুভেন্দু : বিজেপির ‘ফোর্সড ব্যাটলফিল্ড’ কৌশল

ভবানীপুরেই মমতাকে আটকে রাখার কৌশল? শুভেন্দুকে সামনে রেখে বিজেপির নতুন রাজনৈতিক চাল ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করে বিজেপি কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের গড়েই আটকে রাখার কৌশল নিয়েছে? রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ। লিখছেন শুভব্রত

ভবানীপুরে শুভেন্দু : বিজেপির ‘ফোর্সড ব্যাটলফিল্ড’ কৌশল

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রতীকী লড়াইয়ের গুরুত্ব সব সময়ই প্রবল। এবার বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে একই সঙ্গে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর আসনে প্রার্থী করা যে বিজেপির নিছক সংগঠনিক সিদ্ধান্ত নয়, তা স্পষ্ট। এর মধ্যে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল। যার মূল লক্ষ্য একটাই— মুখ‌্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ‌্যায়কে তাঁর নিজের ‘রাজনৈতিক দুর্গ’ ভবানীপুরেই আটকে রাখা এবং সেই লড়াইকে রাজ্য-রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসা।

ভবানীপুর দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ঘাঁটি। কলকাতার এই কেন্দ্রটি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে প্রায় একাত্ম হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই কেন্দ্রেই এবার বিজেপি তাদের প্রধান মুখ শুভেন্দু অধিকারীকে নামিয়ে একটি মনস্তাত্ত্বিক লড়াই তৈরি করতে চাইছে। এই কৌশলের লক্ষ্য শুধু একটি আসন জেতা নয়, বরং মমতার রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস ও ভাবমূর্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা। বিজেপি বুঝতে পেরেছে, রাজ্যের রাজনীতিতে মমতার ব্যক্তিত্বই তৃণমূলের প্রধান শক্তি। তাই সেই ব্যক্তিত্বকে ঘিরেই যদি সরাসরি দ্বৈরথ তৈরি করা যায়, তবে রাজনৈতিক বার্তাটি অনেক বেশি জোরালো হবে।

এই প্রেক্ষাপটে মমতার সামনে বড় সমস্যাটি হল তিনি একসঙ্গে দু’টি আসনে প্রার্থী হতে পারবেন না। অতীতে অনেক নেতাই নিরাপত্তার জন্য একাধিক কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মমতার পক্ষে সেই পথ বেছে নেওয়া সহজ নয়। যদি তিনি ভবানীপুরের পাশাপাশি অন্য কোনও আসন থেকেও প্রার্থী হন, তাহলে জনমানসে এই ধারণা তৈরি হতে পারে যে তিনি নিজের গড় ভবানীপুরে জয়ের বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত নন। বিজেপি তখন সেই বিষয়টিকেই প্রচারের অস্ত্র বানাবে। অর্থাৎ, দ্বৈত প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্তই তাঁর রাজনৈতিক বার্তাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

ফলে মমতার সামনে বাস্তবে একটিই পথ—ভবানীপুরে থেকেই লড়াই করা এবং সেখানে বড় ব্যবধানে জিতে নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অটুট প্রমাণ করা। কিন্তু সেটাই এখন তৃণমূলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বিজেপি যদি ভবানীপুরকে রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রীয় মঞ্চে পরিণত করতে পারে, তাহলে এই কেন্দ্রের ফলাফল প্রতীকী গুরুত্ব পাবে বহু গুণ বেশি। শুধু একটি আসনের জয়-পরাজয় নয়, বরং তা হয়ে উঠবে নেতৃত্বের লড়াইয়ের সূচক।

অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারীর অবস্থান তুলনামূলকভাবে অনেক স্বচ্ছন্দ। তিনি ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রামে মমতাকে পরাজিত করার রাজনৈতিক পরিচয় বহন করেন। ফলে ভবানীপুরে তাঁর প্রার্থী হওয়া অনেকটাই আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বার্তা। কিন্তু এই লড়াইয়ে হারলেও তাঁর রাজনৈতিক ক্ষতি খুব বেশি হবে না। কারণ তিনি সহজেই বলতে পারবেন যে দলের নির্দেশেই তিনি ভবানীপুরে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে চ্যালেঞ্জ করে সেখানে যাননি। অর্থাৎ এই লড়াইয়ে তাঁর লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি, কিন্তু ক্ষতির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিজেপির এই পদক্ষেপটি এক ধরনের ‘ফোর্সড ব্যাটলফিল্ড’ কৌশল। তারা চায় মমতাকে এমন এক লড়াইয়ে নামাতে যেখানে তাঁর পিছু হটার সুযোগ কম এবং প্রতিটি পদক্ষেপই রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে। অন্যদিকে তৃণমূলের লক্ষ্য হবে এই লড়াইকে ব্যক্তিগত দ্বৈরথে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে যাওয়া—যেখানে সরকারের কাজ, সংগঠনের শক্তি এবং জনসংযোগই হবে প্রধান ইস্যু।

সুতরাং ভবানীপুরের লড়াই এবার শুধু একটি বিধানসভা আসনের নির্বাচন নয়। এটি হয়ে উঠতে পারে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির প্রতীকী যুদ্ধক্ষেত্র। সেখানে একদিকে থাকবে মমতার নিজের রাজনৈতিক দুর্গ রক্ষার লড়াই, আর অন্যদিকে থাকবে শুভেন্দুর নেতৃত্বে বিজেপির মনস্তাত্ত্বিক চাপের রাজনীতি। শেষ পর্যন্ত ফল যাই হোক, এই দ্বৈরথ যে ২০২৬ সালের নির্বাচনের রাজনৈতিক বয়ান অনেকটাই নির্ধারণ করে দেবে, তা বলাই যায়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন