পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নারী প্রতিনিধিত্ব ও নারীকেন্দ্রিক নীতির প্রশ্নটি এখন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠছে। তাকে অস্বীকার করতে পারছে না বামেরাও। লিখছেন অনন্যা
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বহুদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—বামফ্রন্ট কি আবার নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনতে পারবে? দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর সংগঠনগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়া এই রাজনৈতিক শিবিরের সামনে প্রতিটি নির্বাচনই কার্যত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সেই প্রেক্ষাপটে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বামফ্রন্টের প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ বোধহয় নয়। এই তালিকার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একটি নতুন রাজনৈতিক বার্তা এবং নিজেদের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত।
প্রথম তালিকায় মোট ১৯২ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বামফ্রন্ট। তার মধ্যে ২৭ জন মহিলা প্রার্থী, যা শতাংশের হিসেবে ১৪ শতাংশেরও বেশি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বহুদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—বামফ্রন্ট কি আবার নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনতে পারবে? দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর সংগঠনগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়া এই রাজনৈতিক শিবিরের সামনে প্রতিটি নির্বাচনই কার্যত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সেই প্রেক্ষাপটে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বামফ্রন্টের প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ বোধহয় নয়। এই তালিকার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একটি নতুন রাজনৈতিক বার্তা এবং নিজেদের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত।
প্রথম তালিকায় মোট ১৯২ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বামফ্রন্ট। তার মধ্যে ২৭ জন মহিলা প্রার্থী, যা শতাংশের হিসেবে ১৪ শতাংশেরও বেশি।
সংখ্যার বিচারে এটি হয়তো বিপ্লবাত্মক কোনও পরিবর্তন নয়, কিন্তু রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বাম রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ ছিল—দলীয় সংগঠনে মহিলাদের উপস্থিতি থাকলেও প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সীমিত। সেই সমালোচনার প্রেক্ষাপটে এবারের তালিকায় মহিলাদের সংখ্যা বাড়ানো একটি সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই তালিকায় কয়েকটি পরিচিত নামও রয়েছে, যাদের উপস্থিতি বাম রাজনীতির নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, যিনি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ছাত্র ও যুব আন্দোলনের মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন। একইভাবে দেবলীনা হেমব্রম, মৌসুমী ঘোষ, দীপ্সিতা ধরের মতো নেত্রীদের প্রার্থী করা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা—বাম রাজনীতি নতুন মুখ ও নতুন প্রজন্মকে সামনে আনতে চাইছে। বিশেষ করে ছাত্র-যুব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেত্রীদের সামনে আনা থেকে বোঝা যায় যে বামফ্রন্ট নিজেদের রাজনৈতিক বয়ানকে আবার রাস্তাঘাটের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছে।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নারী প্রতিনিধিত্ব ও নারীকেন্দ্রিক নীতির প্রশ্নটি এখন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠছে। তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের রাজ্য সরকার মহিলাদের জন্য সরাসরি আর্থিক ভাতা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ চালু ছাড়াও, কন্যাশ্রী প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে চলেছে। ফলে মহিলা ভোটারদের একটি বড় অংশ মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে থাকবে এটা স্বাভাবিক। বিধানসভা নির্বাচন হোক বা লোকসভা নির্বাচন – তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় মহিলাদের অংশগ্রহণ থাকে উল্লেখযোগ্য। সেদিক থেকে মহিলা ভোট টানতে মহিলা প্রার্থী বাড়ানো ছাড়া বামেদেরও আর উপায় নেই।
রাজনৈতিক অবস্থানগত ভাবেও বামদের দীর্ঘদিনের একটি দাবিই হল আইনসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ। সংসদ এবং রাজ্য বিধানসভায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য এই দাবি বহু দশক ধরে বাম দলগুলি তুলে এসেছে। তাদের যুক্তি হল, রাজনীতিতে নারীদের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে কেবল সামাজিক বা সাংগঠনিক উৎসাহ যথেষ্ট নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমেও সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে। সেই কারণেই আইনসভায় সংরক্ষণের দাবি বামপন্থী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। বামেদের মতে, সংরক্ষণ কার্যকর হলে রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেই নারীরা স্থায়ী জায়গা পাবেন এবং নীতিনির্ধারণে তাঁদের ভূমিকা বাড়বে।
তবে প্রশ্ন হল, মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর বামেদের এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মূল লড়াই কার্যত দুই শিবিরের মধ্যে—একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এবং অন্যদিকে বিজেপি। এই দ্বিমুখী মেরুকরণের মধ্যে বামফ্রন্টের জায়গা অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়েছে। ফলে শুধুমাত্র নতুন মুখ বা মহিলা প্রার্থী বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, তার সঙ্গে সংগঠন পুনর্গঠন এবং জনসংযোগ বাড়ানোও সমান জরুরি।
তবু এই তালিকার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—বামফ্রন্ট অন্তত প্রতীকীভাবে নিজেদের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের একটি রূপরেখা তুলে ধরতে চাইছে। সেখানে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, নতুন প্রজন্মকে সামনে আনা এবং আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। বাস্তবে এই কৌশল কতটা ভোটে প্রতিফলিত হবে, তা অবশ্য নির্বাচনের ফলই বলবে। কিন্তু আপাতত এটুকু বলা যায়, ২০২৬-এর নির্বাচনে বামফ্রন্ট নিজেদের পুরনো ছকে আটকে না থেকে নতুন রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন