নজিরবিহীন নির্দেশ, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নজরদারিতে বিচারক নিয়োগের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ায় জট কাটাতে বিচারক ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মোতায়েনের নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্য-নির্বাচন কমিশনের টানাপোড়েন নিয়ে উদ্বেগ।

নজিরবিহীন নির্দেশ, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নজরদারিতে বিচারক নিয়োগের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

উদয় বাংলা ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে জটিলতা কাটাতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ করল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার দেশের শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছে, এই প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে রাজ্যে বিচার বিভাগীয় আধিকারিক, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদেরও কাজে লাগানো হোক। আদালতের মতে, রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন-এর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।


প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে শুক্রবার এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি ছিল। বেঞ্চের অন‌্য দুই সদ‌্য হলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপিন পাঞ্চোলি। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের জেরে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ কার্যত থমকে রয়েছে। বিশেষ করে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ তালিকাভুক্ত ভোটারদের দাবি ও আপত্তি নিষ্পত্তির কাজ আটকে আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছেন, কিন্তু সেই নথির সত্যতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না।

আদালত জানায়, এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি আধা-বিচারিক প্রক্রিয়া, যা সাধারণ প্রশাসনিক আধিকারিকদের পক্ষে সবসময় সহজ নয়। ফলে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের সাহায্য নেওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই। সেই কারণেই কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করা হয়েছে, জেলার স্তরে দায়িত্ব পালনের জন্য কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের নিয়োগ করতে। প্রতিটি জেলায় এই আধিকারিকরা নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন।

তবে এই নির্দেশের ফলে নিয়মিত আদালতের কাজ কিছুটা ব্যাহত হতে পারে বলেও স্বীকার করেছে শীর্ষ আদালত। তাই অন্তর্বর্তীকালীন মামলাগুলি সাময়িকভাবে অন্য বেঞ্চে স্থানান্তরের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট-কে। আদালত রাজ্য সরকারকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

শুনানিতে আদালত রাজ্যের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে। অভিযোগ ওঠে, নির্বাচন কমিশনকে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ আধিকারিক দেওয়া হয়নি। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানায়, অদক্ষ কর্মীদের দিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করানো হলে সাধারণ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে, রাজ্যের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে পর্যাপ্ত সংখ্যক সাব-ডিভিশনাল অফিসার নেই। প্রয়োজনে অন্য রাজ্য থেকে প্রশিক্ষিত আধিকারিক আনার সম্ভাবনাও উত্থাপিত হয়। তবে সেই ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে অজ্ঞতা সমস্যার কারণ হতে পারে বলেও আদালতে উল্লেখ করা হয়।

এই মামলায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-ও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিধানসভা নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি এই সংশোধন প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে এবং এতে বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আদালত নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করে জানিয়েছে, নামের অসঙ্গতি ইত্যাদি কারণে নোটিস পাঠানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত। অভিযোগ উঠেছে, সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে হিংসা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে রাজ্যের পুলিশ প্রধানকে কড়া বার্তা দিয়ে আদালত জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তার বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে।

এদিকে, নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সংশোধন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক তালিকা ২৮ ফেব্রুয়ারির পর প্রকাশ করা সম্ভব হতে পারে। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, সেই তালিকাকে চূড়ান্ত ধরা যাবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তীতে সাপ্লিমেন্টারি তালিকাও প্রকাশ করতে হবে।

মামলার পরবর্তী শুনানি মার্চ মাসে হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে আদালতের নির্দেশ মেনে সংশোধন প্রক্রিয়া কতদূর এগোয়, সেটাই এখন দেখার।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন