বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলায় জোরদার দলবদল। কোন কোন নেতা দল পরিবর্তন করেছেন এবং তার রাজনৈতিক প্রভাব কী? লিখছেন দ্বৈপায়ন কর
বিধানসভা নির্বাচনের মুখে শিবির বদলের রাজনীতি ক্রমে তীব্র হচ্ছে। প্রার্থীপদ ঘোষণা হোক বা সম্ভাব্য জয়ের সমীকরণ—সবকিছুর কেন্দ্রে এখন একটাই শব্দ, দলবদল। এক দল থেকে অন্য দলে যাওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়, তবে নির্বাচন যত এগিয়ে আসে, ততই এই প্রবণতা গতি পায়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, এই দলবদল কি আদৌ ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় কোনও প্রভাব ফেলে, নাকি শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হয়ে ওঠে দলীয় প্রতীক, নেতৃত্ব এবং স্থানীয় ইস্যুগুলিই?
উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা শঙ্কর মালাকারের দলত্যাগ। দীর্ঘদিনের কংগ্রেস নেতা হিসেবে পরিচিত এই বিধায়ক দল ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। এর আগে উত্তরবঙ্গেই কেন্দ্রীয় প্রাক্তন মন্ত্রী জন বারলাও বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। এসবের আগে তৃণণূলের আরেক বিধায়ক হুমায়ুন কবির তৃণমূল ছেড়ে নিজের দল গড়েছেন। সম্প্রতি কার্শিয়াংয়ের বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণু প্রসাদ শর্মা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। তৃণমূল সাংসদ মৌসম নূর একদা কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে গিয়েছিলেন। পেয়েছিলেন রাজ্যসভার সদস্যপদ। ফের তিনি কংগ্রেসে ফিরেছেন। অন্যদিকে, ময়নার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সংগ্রাম এবার বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দলবদল নতুন নয়। ২০১১ সালের পরিবর্তনের আগে যেমন বাম শিবির থেকে অনেক নেতা তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন, তেমনই ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে তৃণমূল থেকে কিছু নেতা বিজেপিতে এবং আবার বিজেপি থেকে তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনের নজিরও দেখা গিয়েছে। এই আসা-যাওয়া শুধু নেতাদের অবস্থান বদল নয়, বরং ক্ষমতার সম্ভাব্য কেন্দ্রকে ঘিরে একধরনের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস।
ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষেত্রে এই দলবদলের প্রভাব একেবারে যে পড়ে না, তেমনটা নয়। অনেক সময় স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় কোনও নেতা দল বদল করলে তাঁর ব্যক্তিগত ভোটব্যাঙ্ক কিছুটা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামীণ বা আধা-শহুরে এলাকায় যেখানে ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি এখনও শক্তিশালী, সেখানে এই প্রভাব স্পষ্ট। কিন্তু বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ভোটারদের বড় অংশ দলীয় আদর্শ, নেতৃত্ব এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক বয়ানের উপর বেশি ভরসা রাখেন। ফলে শুধু নেতা বদলালেই ভোটের ফল পাল্টে যায়, এমনটা সবসময় সত্য হয় না।
এখানেই আসে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। যিনি আজ একটি দলের হয়ে কথা বলছেন, তিনি যদি কাল অন্য দলে গিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেন, তাহলে সাধারণ ভোটারের মনে তাঁকে নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। তাঁকে কতটা বিশ্বাস করা যায়—এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শহুরে শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়, যেখানে রাজনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে কিন্তু ভোটাররা দলবদলুদের উপর আস্থা রাখেননি। ভোটের মুখে শিবির পাল্টানো চার ‘বাঘা’ নেতা নির্বাচনে পরাজিত হন। তালিকায় রয়েছেন তাপস রায়, অর্জুন সিং, মুকুটমণি অধিকারী, কৃষ্ণ কল্যানি, বিশ্বজিৎ দাস। এছাড়া, ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে আগে যারা শিবির বদলেছিলেন, তাঁদেররও অধিকাংশই ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন। রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে বৈশালী ডালমিয়া, রথীন চক্রবর্তী থেকে, প্রবীর ঘোষাল- সকলেই। তবে ব্যাতিক্রমও আছে। ’১৯-এর লোকসভা ভোটের আগে দলবদল করে, বিজেপিতে গিয়ে জিতে যান অর্জুন সিং। একুশে দলবদল করে বিজেপিতে গিয়ে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেন শুভেন্দু অধিকারী।
তবে রাজনীতিতে দলবদলকে একেবারে নেতিবাচক বলেও অনেকেই দেখেন না। তাঁদের মতে, কোনও নেতা যদি তাঁর আগের দলে কাজ করার সুযোগ না পান, বা আদর্শগত দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তাহলে নতুন দলে যোগ দেওয়া তাঁর গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন দলবদল কেবলমাত্র টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে। তখন ভোটারদের কাছে সেটি ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’ হিসেবেই ধরা পড়ে।
২০২৬-এর নির্বাচন এই প্রেক্ষিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে শুধু দলীয় লড়াই নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতা বনাম বাস্তববাদ— এই দ্বন্দ্বও সামনে আসছে। দলবদলু নেতারা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে মরিয়া, আর রাজনৈতিক দলগুলিও জয় নিশ্চিত করতে তাঁদের জায়গা দিচ্ছে। কিন্তু শেষ কথা বলবে ভোটারই।
অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলার ভোটাররা অনেক সময় প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা ব্যক্তি নয়, পরিস্থিতি বিচার করে ভোট দেন—কখনও উন্নয়নকে প্রাধান্য দেন, কখনও বিরোধিতাকে, আবার কখনও স্থিতিশীলতাকে। তাই দলবদল নির্বাচনের আগে উত্তাপ বাড়ালেও, সেটাই যে চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এটি নির্বাচনের বৃহত্তর সমীকরণের একটি মাত্র অংশ, যেখানে শেষ হিসাব মেলাবে আমজনতার রায়ই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন