চলে গেলেন ‘শংকর’, ৯৩-তে স্তব্ধ বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

প্রয়াত হলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (শংকর)। ‘চৌরঙ্গী’, ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’–সহ বহু কালজয়ী সৃষ্টির রচয়িতা ছিলেন তিনি। শোকপ্রকাশ মুখ্যমন্ত্রীর।

চলে গেলেন ‘শংকর’, ৯৩-তে স্তব্ধ বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

উদয় বাংলা ডেস্ক : বাংলা সাহিত্যের জগতে গভীর শোকের ছায়া। প্রয়াত হলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়, যিনি ‘শংকর’ নামেই পাঠকমহলে অধিক পরিচিত। কলকাতার একটি হাসপালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৯৩। দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। প্রায় দু’সপ্তাহ আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসকদের মতে, গত কিছুদিন যাবৎ তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল হয়ে উঠছিল। গত ডিসেম্বর মাসে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ার পর অস্ত্রোপচারও হয়েছিল তাঁর। যদিও পরে তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন, কিন্তু ফের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ফেব্রুয়ারির শুরুতেই তাঁকে ফের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। শেষ পর্যন্ত আর ফেরানো গেল না বাংলা সাহিত্যের এই বর্ষীয়ান কথাশিল্পীকে।

তাঁর প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, শংকরের মৃত্যু বাংলা সাহিত্য জগতের অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর লেখনীতে সাধারণ মানুষের জীবনের অজানা ও অনুচ্চারিত দিক উঠে এসেছে অনন্য দক্ষতায়। ‘চৌরঙ্গী’, ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’ কিংবা ‘জন অরণ্য’—প্রতিটি সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব জায়গা তৈরি করে নিয়েছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠককে মুগ্ধ করে রেখেছে।

১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর অধুনা বাংলাদেশের যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মণিশংকর। তাঁর বাবা পেশায় আইনজীবী ছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। হাওড়াতেই তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবন কাটে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সাহিত্যজীবনের পথচলা। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রন্থ, তবে ‘কত অজানারে’ উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

তাঁর সাহিত্যকর্ম শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, চলচ্চিত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি চলচ্চিত্রে উত্তম কুমার-এর অভিনয় দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। পাশাপাশি তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দিয়েছিলেন কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায়, যা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

শুধু উপন্যাস নয়, স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী কাজও সমানভাবে প্রশংসিত। তাঁর লেখা ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’ আজও পাঠকমহলে সমাদৃত। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, শহুরে সংগ্রাম, মধ্যবিত্ত মানসিকতার টানাপোড়েন—সবই তাঁর কলমে পেয়েছে গভীরতা ও মানবিকতা।

শংকরের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতে এক শূন্যতার সৃষ্টি হল, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর সৃষ্টি ও ভাবনা আগামী দিনেও পাঠকের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন