পরকীয়া, প্রতিহিংসা আর নৃশংস খুন! ‘এসআইআর’ ফোনেই ফাঁদ

পরকীয়া ও প্রতিহিংসার জেরে ভয়ঙ্কর খুন! এসআইআর-এর নাম করে ডেকে এনে প্রেমিকার স্বামীকে হত্যা, দেহ টুকরো করে খালে ফেলার অভিযোগ। বাদুড়িয়ার রোমহর্ষক ঘটনায় চাঞ্চল্য।

পরকীয়া, প্রতিহিংসা আর নৃশংস খুন! ‘এসআইআর’ ফোনেই ফাঁদ

উদয় বাংলা : উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ায় ভয়াবহ খুনের ঘটনায় শিউরে উঠেছে গোটা এলাকা। পরকীয়া সম্পর্ক, তার জেরে জমে ওঠা প্রতিহিংসা, আর সেই প্রতিহিংসার ভয়ঙ্কর পরিণতি—সব মিলিয়ে যেন বাস্তবের চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর ও রোমহর্ষক কাহিনি উঠে আসছে পুলিশের তদন্তে। নিখোঁজ হওয়ার পাঁচদিন পর একাধিক জায়গা থেকে একের পর এক ব্যাগভর্তি দেহাংশ উদ্ধার হতেই তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়—এটি নিছক খুন নয়, বরং ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

মৃত নাসির আলি, বয়স ৩৮। একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী। গত সোমবার সন্ধ্যায় একটি ফোন আসে তাঁর মোবাইলে। ফোনের ওপারে নিজেকে সরকারি কর্মী পরিচয় দিয়ে জানানো হয়, এসআইআর সংক্রান্ত শুনানির জন্য জরুরি কিছু নথি লাগবে। মায়ের আধার ও ভোটার কার্ডের জেরক্স নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় আসতে বলা হয় নাসিরকে । এও জানিয়ে দেওয়া হয় যে তাঁকে কোথায় আসতে হবে। সরকারি কাজের কথা শুনে একটুও সন্দেহ হয়নি তার। বরং, এসআইআর নিয়ে নানা শঙ্কার মাঝে এই ফোন পেয়ে সমস্ত নথি সঙ্গে করে তখনই মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান নাসির। সেটাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা—এমনটাই মনে করছে পুলিশ।

রাত গভীর হলেও নাসির বাড়ি ফেরে না। তখন পরিবারের সন্দেহ হয়। পাড়ায় খোঁজ-খবর করার পর কোনও সন্ধান না পাওয়ায় তাঁরা আত্মীয়-বন্ধুবান্ধবদের মোবাইলে ফোন করতে থাকেন। কিন্তু, কী আশ্চর্য! কোথাও নাসিরের কোনও খোঁজ মেলে না। তাহলে গেল কোথায়! ছেলেটা যে কর্পূরের মতো একেবারে উবে যাবে, তা তো আর হতে পারে না। আরও অনেকটা সময় অপেক্ষা করে বাড়ির লোক থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করে।

অভিযোগ পেয়ে পুলিশ একটুও দেরি করেনি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু প্রথম কয়েকদিন কোনও স্পষ্ট সূত্র পুলিশের হাতে আসেনি। হঠাৎ বৃহস্পতিবার একটি খালের ধারে পাওয়া যায় নাসিরের জুতো। সেই সূত্র ধরে খালের জলেই মেলে তাঁর মোটরসাইকেল। কিন্তু মানুষটির আর কোনও খোঁজ নেই। এতে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। পথ অবরোধ, আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ—চাপ বাড়তে থাকে পুলিশের উপর।

এরপরই তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। পুলিশ নিখোঁজ নাসিরের মোবাইল ফোনের কললিস্ট ঘাঁটতে শুরু করে। তাতেই উঠে আসে এক চাঞ্চল‌্যকর তথ‌্য। তখনই পুলিশের সন্দেহের তালিকায় উঠে আসে একটি নাম– রিজওয়ান হাসান মণ্ডল। পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পার্শ্বশিক্ষক, পাশাপাশি এলাকার বিএলও হিসেবেও এসআইআর-এ কাজ করছেন তিনি। পুলিশ তাঁকে আটক করে জেরা শুরু করে। প্রথমটা সে কিছুই স্বীকার করতে চায়নি। পরে লাগাতার পুলিশি জেরায় সে ভেঙে পড়ে। সব স্বীকার করে নেয়। ধীরে ধীরে খুলতে থাকে খুনের রহস্য। যা শুনে দুঁদে গোয়েন্দাদেরও হাড় হিম হয়ে যায়।

পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, নাসিরের স্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই রিজওয়ানের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক নিয়েই ইদানিং টানাপোড়েন চলছিল। নাসির এই সম্পর্কের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আর সেই ‘পথের কাঁটা’ সরিয়ে দিতে রিজওয়ান নাকি পরিকল্পনা করেন খুনের। তদন্তকারীদের ধারণা, বেশ কিছুদিন ধরেই এই খুনের ছক কষা হচ্ছিল। তবে রিজওয়ান একা খুন করেননি নাসিরকে। তাঁকে এই কাজে সাহায‌্য করেছে আরও একজন। তাঁর নাম সাগর গাইন। পুলিশি জেরার রিজওয়ানই জানায় সেকথা।

সম্ভাব্য ঘটনাক্রম অনুযায়ী, প্রথমে নাসিরকে ফাঁদে ফেলতে সরকারি কাজের অজুহাত ব্যবহার করা হয়। এসআইআর-এর নাম করে ফোন করে তাঁকে নির্জন জায়গায় ডেকে আনা হয়। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল রিজওয়ান ও তার সহযোগী সাগর গাইন। পরিকল্পনা মতো নাসির পৌঁছনোর পর তাঁকে প্রথমে বশে আনা হয়, তারপর নির্মমভাবে খুন করা হয়। খুনের পরেই শুরু হয় আরও ভয়াবহ অধ্যায়—প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা।

পুলিশি জেরায় রিজওয়ান স্বীকার করেছেন, খুনের পর দেহ টুকরো টুকরো করা হয়। তারপর সেই দেহাংশ ছোট ছোট ব্যাগে ভরে রাতের অন্ধকারে বাদুড়িয়ার বিভিন্ন খাল, নদী ও ব্রিজের নীচে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে সহজে কেউ খোঁজ না পায়। এই কাজে তাকে সাহায্য করে সাগর গাইন। দু’জনেই ভেবেছিল, এভাবে দেহ গায়েব করে দিলে কখনও সত্যিটা সামনে আসবে না!

কিন্তু শেষরক্ষা হল না। পুলিশের লাগাতার জেরা আর কল রেকর্ডের সূত্রে ধরা পড়ে যায় পুরো চক্রান্তটাই। এরপর তল্লাশি চালিয়ে শনিবার তিন জায়গা থেকে তিনটি আলাদা ব্যাগে ভরা নাসিরের দেহাংশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুরো ঘটনা জানতে পেরে স্তম্ভিত হয়ে যায় বাদুড়িয়ার মানুষ।

স্থানীয়রা পুলিশকে জানায়, নাসিরের স্ত্রী ও রিজওয়ানের মধ্যে পরকীয়া সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিবাদ চলছিল। যদিও পরিবার প্রকাশ্যে কিছু বলতে চায়নি, কিন্তু ক্যামেরার বাইরে অনেকেই স্বীকার করেছেন, এই অবৈধ সম্পর্কই এই ভয়াবহ পরিণতির কারণ। পুলিশও প্রাথমিকভাবে মনে করছে, প্রতিহিংসা থেকেই এই খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

তবে তদন্ত এখনও চলছে। কীভাবে খুন করা হয়েছিল, ঠিক কোথায় দেহ টুকরো করা হয়, আর এই ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না—সবদিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ। অভিযুক্তদের হেফাজতে নিয়ে আরও জেরা চলছে।



Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন