বেকার ভাতা, নাকি কর্মসংস্থানের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি?

পশ্চিমবঙ্গের যুব সাথী প্রকল্প কি সত্যিই মানবিক উদ্যোগ, নাকি কর্মসংস্থানের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা? প্রশ্ন উঠছে। লিখছেন সাত্যকি

বেকার ভাতা, নাকি কর্মসংস্থানের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি?

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আনা নতুন ‘যুব সাথী’ প্রকল্প ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের জনমোহিনী আবহ তৈরি হয়েছে। শিক্ষিত বেকার যুবকদের হাতে মাসে নগদ ১৫০০ টাকা তুলে দেওয়ার ঘোষণা—শুনতে নিঃসন্দেহে মানবিক, সহানুভূতিশীল এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু কোনও নীতির মূল্যায়ন যদি আবেগের বাইরে দাঁড়িয়ে করা হয়, তবে এই প্রকল্পকে ঘিরে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

রবিবার থেকে শিবর করে যুব সাথী প্রকল্পের আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। তাতে ‘বিপুল’ সাড়া মিলিছে। গ্রাম থেকে শহর– যুবক-যবতীরা ভাতার জন‌্য ফর্ম তোলার লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তবে কোনও রাজ্যে বেকারভাতার জন্য দীর্ঘ লাইন কখনওই সেই রাজ্যের পক্ষে অন্ততপক্ষে সাফল্যের সূচক নয়, বরং তা ব্যর্থতার প্রতীক। অর্থাৎ, এই বিপুল সংখ‌্যক মানুষ শিক্ষিত কর্মহীন। সরকার এদের সরকারি বা বেসরকারি কর্মসংস্থান করতে ব‌্যর্থ হয়েছে। তারা যে ছোটখাটো স্বনির্ভর কর্মসংস্থান করবেন, তেমন বাজার ও সুযোগ-সুবিধা দিতে সরকার ব‌্যর্থ হয়েছে। একটি সরকারের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি—সরকারি ও বেসরকারি, উভয় ক্ষেত্রেই। সেখানে যদি লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী মাসে ১৫০০ টাকার ভাতার উপর নির্ভর করতে বাধ্য হন, তবে তা সরাসরি ইঙ্গিত করে যে রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং কর্মসংস্থান নীতিতে গুরুতর ঘাটতি রয়ে গিয়েছে। সরকার নিজেই যেন স্বীকার করছে—চাকরি দেওয়ার বদলে সামান্য ভাতা দিয়ে সমস্যা ঢাকার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এই প্রকল্পের বয়সসীমা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। মাধ্যমিক পাশ করে ২১ বছর বয়সেই একজন যুবক বা যুবতীকে ‘বেকার’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভাতা দেওয়া কি বাস্তবসম্মত? এই বয়সে একজন ছাত্রের স্বাভাবিক গন্তব‌্য হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন বা পেশাগত প্রশিক্ষণের দিকে এগিয়ে যাওয়া। সেখানে সরকার নিজেই যেন একটি মানসিকতা তৈরি করছে—পড়াশোনা বা দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে সরাসরি ভাতার লাইনে দাঁড়ানোই স্বাভাবিক। আরও বিস্ময়ের বিষয়, যারা কলেজ বা উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ পাচ্ছেন, তাঁরাও এই বেকারভাতার আওতায় আসবেন। অর্থাৎ, যিনি পড়াশোনা করছেন, তিনিও ‘বেকার’—এই যুক্তি কি কোনও অর্থনৈতিক বা সামাজিক বিশ্লেষণে টেকে?

এই প্রকল্পে কোনও সক্রিয় কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত শর্তের অভাব স্পষ্ট। অন্যান্য রাজ্যে যেখানে বেকারভাতার জন্য কঠোর নিয়ম থাকে—চাকরির জন্য আবেদন করা, কর্মসংস্থান দপ্তরে নাম নথিভুক্ত করা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাকরি না পাওয়া—সেখানে এই প্রকল্প তুলনামূলকভাবে শিথিল। ফলে এটি কর্মসংস্থান উৎসাহের বদলে এক ধরনের ‘নির্ভরতার সংস্কৃতি’ তৈরি করবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি শ্রমবাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণ কমাতে পারে, যা কোনও অর্থনীতির পক্ষেই সুস্থ লক্ষণ নয়।

বরং যুক্তিযুক্ত এটাই হতে পারতো– বিশ্ববিদ‌্যালয়ের স্নাতক হওয়ার পর অন্তত তিনটি সরকারি ও তিনটি বেসরকারি লিমিটেড কোম্পানিতে চাকরির আবেদন করে ব‌্যর্থ হয়েছেন, সেক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত সাময়িকভাবে (পাঁচবছর অথবা চাকরি পাওয়া পর্যন্ত) মাসে ৫ হাজার টাকা করে যদি কর্মসংস্থান উৎসাহ ভাতা দেওয়া হত। এই পাঁচ বছরের মধ্যে তাঁকে অন্তত তিনটি সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থায় চাকরির পরীক্ষা, তিনটি স্বনিযুক্তি প্রকল্পের প্রজেক্ট দিয়ে ঋণের আবেদন করার শর্ত দিতে হত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই প্রকল্পকে ঘিরে রাজনৈতিক নীরবতা। বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় বিরোধী দলগুলিও সরাসরি সরকারের সমালোচনায় যেতে চাইছে না। কিন্তু জনস্বার্থের প্রশ্নে নীরবতা কখনওই সমাধান নয়। বেকারত্বের মতো একটি গভীর সমস্যা শুধুমাত্র ভাতা দিয়ে সমাধান করা যায় না। এটি সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার মূলকে অক্ষত রাখে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন