শিলিগুড়িতে মহাকাল মহাতীর্থ মন্দিরের শিলান্যাস মুখ্যমন্ত্রীর, কটাক্ষ বিজেপির

শিলিগুড়িতে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মহাকাল মন্দিরের শিলান্যাস করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই মঞ্চ থেকে পরিযায়ী শ্রমিক নির্যাতনের অভিযোগ, পাল্টা কটাক্ষে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ।

শিলিগুড়িতে মহাকাল মহাতীর্থ মন্দিরের শিলান্যাস, পরিযায়ী শ্রমিক ইস্যু ও মন্দির রাজনীতিতে উত্তাল রাজ্য
শিলান্যাসের পর মঞ্চে বক্তব্য বলছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

শিলিগুড়ি : ঝাড়খণ্ডে বাংলার এক পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বেলডাঙায় রেল ও জাতীয় সড়ক অবরোধের আবহে তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। সেই আবহের মধ্যেই শুক্রবার শিলিগুড়িতে মহাকাল মহাতীর্থ মন্দিরের শিলান্যাস করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিঘার জগন্নাথ ধাম ও নিউটাউনের দুর্গা অঙ্গনের পর উত্তরবঙ্গেও বড় ধর্মীয় পরিকাঠামো গড়ার পথে আরও এক ধাপ এগোল রাজ্য সরকার।

শিলিগুড়ি শহরের কেন্দ্রস্থল মাটিগাড়া-লক্ষ্মী টাউনশিপ এলাকায় ১৭.৪১ একর জমির উপর গড়ে উঠবে এই মহাকাল মন্দির। শিলান্যাস অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মহাকাল মন্দির হতে চলেছে। প্রতিদিন প্রায় এক লক্ষ দর্শনার্থী মন্দিরে আসতে পারবেন। মন্দিরের নাম রাখা হয়েছে ‘মহাকাল মহাতীর্থ মন্দির’। তাঁর কথায়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চার মেলবন্ধন ঘটছে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে, যা বিশ্বজুড়ে পর্যটক ও ভক্তদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই কমপ্লেক্সে শুধু মূল মন্দিরই নয়, বিশ্বের উচ্চতম মহাকাল মূর্তিও স্থাপন করা হবে। মূর্তির মোট উচ্চতা হবে ২১৬ ফুট, যার মধ্যে ১০৮ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জের মূর্তি এবং ১০৮ ফুট উচ্চতার ভিত থাকবে। তিনি আরও বলেন, শিলিগুড়িতে একটি আন্তর্জাতিক মানের কনভেনশন সেন্টার তৈরির জন্য জমি পাওয়া গিয়েছে। রাজ্য সরকার জমি দেবে, বেসরকারি সংস্থা সেই কেন্দ্র নির্মাণ করবে। তাঁর বক্তব্য, শিলিগুড়ি আর শুধু ট্রানজ়িট পয়েন্ট নয়, এটি ব্যবসা ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

মহাকাল মন্দিরের নকশা ও পরিকাঠামো নিয়েও বিস্তারিত জানান মুখ্যমন্ত্রী। মন্দিরের ১০৮ ফুট প্যাডেস্ট্রিয়াল ব্লকে থাকবে পূর্ব ও পশ্চিমমুখী দু’টি নন্দীগৃহ, একটি মিউজ়িয়াম ও সংস্কৃতি হল। মন্দির প্রাঙ্গণের সীমানা জুড়ে থাকবে ১২টি অভিষেক লিঙ্গ মন্দির এবং ভারতের ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের প্রতিমূর্তি। দু’টি প্রদক্ষিণ পথে একসঙ্গে প্রায় ১০ হাজার ভক্ত সমবেত হতে পারবেন। শিবালয়ের রীতি অনুযায়ী চার কোণে গণেশ, কার্তিক, শক্তি ও বিষ্ণুনারায়ণের মূর্তি থাকবে। পাশাপাশি দু’টি সভামণ্ডপে একসঙ্গে ছ’হাজারের বেশি মানুষ বসতে পারবেন।

মন্দির চত্বরে মহাকালের কাহিনি ও মহিমা তুলে ধরা হবে পাথরের শিল্পকর্ম ও ফ্রেস্কো পেন্টিংয়ের মাধ্যমে। থাকবে রুদ্রাক্ষ কুণ্ড ও অমৃত কুণ্ড, যেখান থেকে ভক্তরা পবিত্র জল সংগ্রহ করতে পারবেন। প্রসাদ বিতরণ কেন্দ্র, স্যুভেনির আর্কেড, ক্যাফেটেরিয়া, ডালা কমপ্লেক্স এবং পুরোহিতদের থাকার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, পাহাড় ও সমতলের আধ্যাত্মিক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে এবং ধর্ম, পর্যটন ও ব্যবসার সমন্বয়ে এই অঞ্চলকে গ্লোবাল ট্যুরিজ়ম হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যার ফলে বিপুল কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

শিলান্যাস অনুষ্ঠানের শেষে মুখ্যমন্ত্রী জানান, পঞ্জিকা দেখেই শুভদিন নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট সময়ে শিলান্যাস সম্পন্ন হয়েছে। ট্রাস্টের সদস্য ও ধর্মীয় গুরুদের উপস্থিতিতে শিলান্যাস হয়। মন্দিরের কাজ শেষ হতে প্রায় আড়াই বছর সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।

এই মঞ্চ থেকেই ভিন রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থার প্রসঙ্গ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্যই বিভিন্ন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর আক্রমণ হচ্ছে। তিনি বলেন, জীবন নেওয়া কখনও ধর্ম হতে পারে না, জীবন দেওয়াই ধর্ম।

মহাকাল মন্দিরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ কটাক্ষের সুরে বলেন, পরিস্থিতির চাপে কেউ কেউ এখন মন্দিরে যাচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, হিন্দুদের খুশি করতে তৃণমূল মন্দির করছে, কিন্তু তাতে মানুষের মন জয় হবে না। তৃণমূলের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, উদ্দেশ্য সৎ না হলে ভগবানও বাধা দেন। এর মধ্যেই ধর্ম, রাজনীতি ও পরিযায়ী শ্রমিক ইস্যু মিলিয়ে রাজ্য রাজনীতি আরও একবার উত্তাল হয়ে উঠল।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন