ঝাড়খণ্ডে মৃত্যু বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকের, বেলডাঙায় রেল ও জাতীয় সড়ক অবরোধ, তপ্ত রাজনীতি

ঝাড়খণ্ডে বাংলাদেশি সন্দেহে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যু।দেহ ফেরার পর বেলডাঙায় রেললাইন ও ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ, পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

ঝাড়খণ্ডে মৃত্যু বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকের, বেলডাঙায় রেল ও জাতীয় সড়ক অবরোধ, তপ্ত রাজনীতি
চলছে পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ।


উদয় বাংলা ব্যুরো : ফের ভিন রাজ্যে খুন হল বাংলার এক পরিযায়ী শ্রমিক। অভিযোগ, বাংলাদেশি সন্দেহে ঝাড়খণ্ডে হত্যা করা হয়েছে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার বাসিন্দা আলাউদ্দিন শেখকে। ঝাড়খণ্ডে তাঁর ঘর থেকেই গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় দেহ উদ্ধার হয়। এই খবর সামনে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন মৃতের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা। দেহ বেলডাঙায় ফিরতেই রেললাইন ও ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু হয়। তার জেরে ব্যাহত হয় রেল চলাচল, রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় গোটা এলাকা।



এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই উত্তরবঙ্গ সফরে যাওয়ার পথে দমদম বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে বেলডাঙার অশান্তি নিয়ে মুখ খোলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বেলডাঙায় বিক্ষোভরত সংখ্যালঘুদের ক্ষোভ সম্পূর্ণ বৈধ। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর বারবার অত্যাচার হচ্ছে—কোথাও খুন, কোথাও হেনস্তা। এই পরিস্থিতিতে মানুষের ক্ষোভ হওয়াই স্বাভাবিক। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে একটি রাজনৈতিক দল। নাম না করে বিজেপিকে নিশানা করে মমতা বলেন, কারা উসকানি দিচ্ছে সবাই জানে, বাংলায় বিভাজনের রাজনীতি চলবে না। নিহতের পরিবারের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে প্রশাসনের তরফে মৃতের পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি এবং ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেছেন মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক নীতিন সিংঘানিয়া।

ঘটনার গুরুত্ব বুঝে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ঝাড়খণ্ডে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক হত্যায় যাঁরা জড়িত, তাঁদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, ঝাড়খণ্ড সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং সে রাজ্যের পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

মৃত শ্রমিকের নাম আলাউদ্দিন শেখ, বয়স ৩৬ বছর। তিনি মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানার সুজাপুর তালপাড়ার বাসিন্দা। পাঁচ বছর আগে রুজির খোঁজে ঝাড়খণ্ডে গিয়েছিলেন আলাউদ্দিন এবং সেখানে ফেরিওয়ালার কাজ করতেন। পরিবারের দাবি, কাজ করতে গিয়ে তাঁকে বারবার বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। ভারতীয় নাগরিক হওয়ার পরিচয়পত্র দেখালেও কোনও লাভ হয়নি। পরিবারের সঙ্গে শেষবার তাঁর কথা হয়েছিল গত বৃহস্পতিবার, তখনই তিনি ভয় পাচ্ছেন বলে জানিয়েছিলেন। শুক্রবারই ঘর থেকে উদ্ধার হয় তাঁর দেহ।

পরিবারের দৃঢ় দাবি, আলাউদ্দিন আত্মহত্যা করেননি। তাঁকে খুন করে প্রমাণ লোপাটের জন্য গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকায়। মৃত্যুর খবর ছড়াতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন পরিবার ও প্রতিবেশীরা। রেললাইন ও জাতীয় সড়ক অবরোধের ফলে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও র‍্যাফ নামাতে হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যাত্রী ভোগান্তির ছবি ও ভিডিও সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি অভিযোগ করেন, বেলডাঙায় কয়েক ঘণ্টা ধরে জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ, পাথর ছোড়া হচ্ছে, জোর করে ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

এদিকে পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পলামু জেলার বিশ্রামপুরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরী। বেলডাঙার মহেশপুরে গিয়ে তিনি মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। সেখান থেকেই ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন অধীর। তাঁর বক্তব্য, হেমন্ত সোরেন বিদেশে থাকলেও পলামুর আইজি শৈলেন্দ্র কুমারের সঙ্গে কথা বলে তিনি ঘটনার প্রাথমিক তথ্য জানতে পেরেছেন। আইজির দাবি অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার ইঙ্গিত মিললেও অধীর চৌধুরী পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর সংযোজন, বাংলাদেশি সন্দেহে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে সমস্যা তৈরির অভিযোগ নতুন নয়, আধার কার্ড দেখাতে বাধ্য করা হচ্ছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শীঘ্রই পলামুর বিশ্রামপুরে গিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।

জনতা উন্নয়ন পার্টির (জেপিইউ) চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবির এক ফেসবুক বার্তায় বলেন, আর কত প্রাণ গেলে চোখ খুলবে সরকারের? পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? কেন বারবার আমাদের জেলার শ্রমিকদের ভিন রাজ্যে অকালে প্রাণ হারাতে হবে? পেটের দায়ে ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে ফের প্রাণ হারালেন বেলডাঙার সন্তান আলাউদ্দিন শেখ,ঝাড়খণ্ডে তাকে পিটিয়ে মেরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং পরিবারের প্রতি বিচারের দাবিতে আজ বেলডাঙা স্তব্ধ। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অবরোধ প্রমাণ করছে যে তারা আর বঞ্চনা সহ্য করবে না। আমাদের দাবি, অবিলম্বে দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকারি সাহায্য দিতে হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন