‘ধুরন্ধর’ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র রেহমান ডাকাইত কীভাবে গব্বর সিংয়ের ছায়ায় তৈরি এক মিথ হয়ে ওঠে এবং কেন ছবির প্লট ‘শোলে’-র সঙ্গে এত স্পষ্টভাবে মিলে গেল? লিখছেন অর্ঘ্য
তিন ঘণ্টার সিনেমা এখন আর হয় না। সেখানে ‘ধুরন্ধর’ টানা সাড়ে তিনঘণ্টা দর্শককে সিটে বসিয়ে রাখল। সম্ভবত, শেষবার ৫০ বছর আগে ‘শোলে’ এই কাজটি করতে পেরেছিল। নিশ্চয়, খুব সচেতনভাবেই ‘শোলে’র প্রসঙ্গটা উঠল। কারণ, পরিচালক আদিত্য ধরের ‘ধুরন্ধর’ এক নিশ্বাসে দেখার পর হল থেকে বেরিয়ে বোধগম্য হল এতো ‘আজকের শোলে’!
‘ধুরন্ধর’ ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র আর কেউ নয়, রেহমান বালোচ ওরফে রেহমান ডাকাইত। যে পর্দায় আসার অনেক আগেই দর্শকের মনে ঢুকে পড়ে। তার উপস্থিতি নয়, বরং তার অনুপস্থিতিই প্রথমে ভয় তৈরি করে। মহল্লা আতঙ্কে কাঁপে, লোকমুখে ফেরে তার নাম, তার নিষ্ঠুরতার গল্প, তার অমানবিক ক্ষমতার কাহিনি। এই নির্মাণ প্রক্রিয়াটা এতটাই পরিচিত যে শোলে-দেখা দর্শক হিসেবে একটু থমকে যেতে হয়। কারণ ঠিক এই পথেই তো রমেশ সিপ্পি গড়েছিলেন গব্বর সিং চরিত্রটি।
‘শোলে’-তে গব্বর সিং পর্দায় আসার আগেই তার কারনামা নিয়ে আলোচনা। গব্বর যেন একটা ধারণা, একটা আতঙ্কের প্রতীক। ‘ধুরন্ধর’-এ রেহমান ডাকাইতও তেমনই। সে যেন শুধু একজন মানুষ নয়, সে একটা মিথ। পরিচালক আদিত্য ধর সচেতনভাবেই এই মিথ-নির্মাণকে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু সমস্যা হল—এই ব্যবহার পরিচিত।
রেহমানের চরিত্রায়ণে যে নির্মমতা, যে ভয়ানক আভিজাত্য, তা গব্বর সিংয়ের ছাঁচেই ঢালা। গব্বর যেমন হাসতে হাসতে খুন করে, তেমনি রেহমানও ঠান্ডা মাথায় ধ্বংস চালায়। গব্বর যেমন নিজের দলকে শাসন করে ভয় দেখিয়ে, তেমনি রেহমান ডাকাইতও তার অনুচরদের কাছে ঈশ্বরতুল্য আবার রাক্ষসতুল্য। এই মিলগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, ক্রমাগত একের পর এক এসে দর্শককে মনে করিয়ে দেয়—এই গল্পটা আমি আগেও দেখেছি।
সবচেয়ে বড় সাদৃশ্যটা আসে ছবির কাঠামোয়। ‘ধুরন্ধর’-এর পুরো নাটকীয় উত্তেজনা তৈরি হয় রেহমানকে কেন্দ্র করে, অথচ সে পুরো সময়টাই যেন দূরের কোনও অশুভ ছায়া। ঠিক যেমন ‘শোলে’-তে গব্বর সিং গল্পের চালিকাশক্তি হলেও, কেন্দ্রীয় নায়করা আসলে জয় আর বীরু। এখানেও রেহমানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো চরিত্ররা গল্প এগিয়ে নিয়ে যায়, আর রেহমান হয়ে ওঠে সেই চূড়ান্ত অশুভ শক্তি, যাকে ধ্বংস করতেই হবে।
মনে করুন, সিস্টেমে থেকে হেরে যাওয়া ঠাকুর জয়-বিরুকে ডেকে এনে গব্বরের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। আর ধুরন্ধরে ভারতের এনআইএ/আইবি প্রধান সান্যাল পাকিস্তানের ভারত-বিরোধী সন্ত্রাস-চক্র সিস্টেমে থেকে ভাঙতে না-পেরে, অ-প্রথাগত পদ্ধতিতে এগোচ্ছেন। একজন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড-প্রাপ্ত হামজাকে আন্ডারকভার এজেন্ট করে পাকিস্তানে পাঠাচ্ছেন। ‘শোলে’তে ঠাকুর ডেকে এনেছিলেন জেল-খাটা দুই দুষ্কৃতি জয় আর বিরুকে।
‘শোলে’ শেষ হয়েছিল গব্বরের বিনাশে। ‘ধুরন্ধর’-এর সমাপ্তি রেহমান ডাকাইতের মৃত্যুতেই। এই মৃত্যু যেন কেবল একটি চরিত্রের পরিণতি নয়, বরং একটি যুগের অবসান। এটাও ‘শোলে’-র খুব চেনা পথ। আদিত্য ধর এখানেও সেই একই নৈতিক কাঠামো অনুসরণ করেছেন। ফলে শেষটা নতুন কোনও ধাক্কা দেয় না, বরং আগে থেকেই জানা এক পরিণতির দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।
এখানে প্রশ্ন ওঠে—অনুপ্রেরণা আর নকলের সীমারেখা কোথায়? ‘শোলে’ ভারতীয় সিনেমার এমন এক মাইলফলক, যাকে অস্বীকার করা অসম্ভব। তার প্রভাব থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু ‘ধুরন্ধর’-এ সেই প্রভাব এতটাই নগ্ন যে তা নিজস্বতার জায়গা সংকুচিত করে ফেলে। রেহমান ডাকাইত চরিত্রটি আরও গভীর, আরও আলাদা হতে পারত। এ সময়ের সিনেমায় সে এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু গব্বরের ছায়া এত ঘন যে রেহমান নিজের আলোয় দাঁড়ানোর সুযোগই পায় না।
ফলে ‘ধুরন্ধর’ দেখতে দেখতে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একদিকে অভিনয়, নির্মাণের দক্ষতা চোখে পড়ে, অন্যদিকে গল্পের পরিচিত কাঠামো বারবার মনে করিয়ে দেয়—এই ভয়, এই মিথ, এই মৃত্যু আমরা বহু আগেই দেখেছি। গব্বর সিংয়ের পর্দা কাঁপানো উপস্থিতি যেমন ইতিহাস হয়ে গেছে, রেহমান ডাকাইত তেমন ইতিহাস হয়ে উঠতে চায়, কিন্তু পারে না। কারণ সে জন্ম থেকেই অন্য এক কিংবদন্তির ছায়ায় বড় হয়ে ওঠা চরিত্র।
শেষ পর্যন্ত ‘ধুরন্ধর’ হয়তো এক বিনোদনমূলক ছবি, কিন্তু তা একই সঙ্গে বলিউডের মূলধারার সেই চিরাচরিত সমস্যাকেও সামনে আনে—নিরাপদ পথে হাঁটার প্রবণতা। আদিত্য ধর ‘শোলে’-র প্লট প্রায় হবহু অনুসরণ করে এক পরিচিত কাঠামোয় গল্প বলেছেন। ফলে রেহমান ডাকাইত যত ভয়ংকরই হোক, সে আর কখনও গব্বর সিংয়ের মতো অমর হয়ে থাকবে না। সে থেকে যাবে গব্বরের প্রতিবিম্ব হিসেবেই—নিজের পরিচয়ের চেয়ে যার তুলনাই বেশি মনে পড়ে।
তিন ঘণ্টার সিনেমা এখন আর হয় না। সেখানে ‘ধুরন্ধর’ টানা সাড়ে তিনঘণ্টা দর্শককে সিটে বসিয়ে রাখল। সম্ভবত, শেষবার ৫০ বছর আগে ‘শোলে’ এই কাজটি করতে পেরেছিল। নিশ্চয়, খুব সচেতনভাবেই ‘শোলে’র প্রসঙ্গটা উঠল। কারণ, পরিচালক আদিত্য ধরের ‘ধুরন্ধর’ এক নিশ্বাসে দেখার পর হল থেকে বেরিয়ে বোধগম্য হল এতো ‘আজকের শোলে’!
‘ধুরন্ধর’ ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র আর কেউ নয়, রেহমান বালোচ ওরফে রেহমান ডাকাইত। যে পর্দায় আসার অনেক আগেই দর্শকের মনে ঢুকে পড়ে। তার উপস্থিতি নয়, বরং তার অনুপস্থিতিই প্রথমে ভয় তৈরি করে। মহল্লা আতঙ্কে কাঁপে, লোকমুখে ফেরে তার নাম, তার নিষ্ঠুরতার গল্প, তার অমানবিক ক্ষমতার কাহিনি। এই নির্মাণ প্রক্রিয়াটা এতটাই পরিচিত যে শোলে-দেখা দর্শক হিসেবে একটু থমকে যেতে হয়। কারণ ঠিক এই পথেই তো রমেশ সিপ্পি গড়েছিলেন গব্বর সিং চরিত্রটি।
‘শোলে’-তে গব্বর সিং পর্দায় আসার আগেই তার কারনামা নিয়ে আলোচনা। গব্বর যেন একটা ধারণা, একটা আতঙ্কের প্রতীক। ‘ধুরন্ধর’-এ রেহমান ডাকাইতও তেমনই। সে যেন শুধু একজন মানুষ নয়, সে একটা মিথ। পরিচালক আদিত্য ধর সচেতনভাবেই এই মিথ-নির্মাণকে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু সমস্যা হল—এই ব্যবহার পরিচিত।
রেহমানের চরিত্রায়ণে যে নির্মমতা, যে ভয়ানক আভিজাত্য, তা গব্বর সিংয়ের ছাঁচেই ঢালা। গব্বর যেমন হাসতে হাসতে খুন করে, তেমনি রেহমানও ঠান্ডা মাথায় ধ্বংস চালায়। গব্বর যেমন নিজের দলকে শাসন করে ভয় দেখিয়ে, তেমনি রেহমান ডাকাইতও তার অনুচরদের কাছে ঈশ্বরতুল্য আবার রাক্ষসতুল্য। এই মিলগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, ক্রমাগত একের পর এক এসে দর্শককে মনে করিয়ে দেয়—এই গল্পটা আমি আগেও দেখেছি।
সবচেয়ে বড় সাদৃশ্যটা আসে ছবির কাঠামোয়। ‘ধুরন্ধর’-এর পুরো নাটকীয় উত্তেজনা তৈরি হয় রেহমানকে কেন্দ্র করে, অথচ সে পুরো সময়টাই যেন দূরের কোনও অশুভ ছায়া। ঠিক যেমন ‘শোলে’-তে গব্বর সিং গল্পের চালিকাশক্তি হলেও, কেন্দ্রীয় নায়করা আসলে জয় আর বীরু। এখানেও রেহমানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো চরিত্ররা গল্প এগিয়ে নিয়ে যায়, আর রেহমান হয়ে ওঠে সেই চূড়ান্ত অশুভ শক্তি, যাকে ধ্বংস করতেই হবে।
মনে করুন, সিস্টেমে থেকে হেরে যাওয়া ঠাকুর জয়-বিরুকে ডেকে এনে গব্বরের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। আর ধুরন্ধরে ভারতের এনআইএ/আইবি প্রধান সান্যাল পাকিস্তানের ভারত-বিরোধী সন্ত্রাস-চক্র সিস্টেমে থেকে ভাঙতে না-পেরে, অ-প্রথাগত পদ্ধতিতে এগোচ্ছেন। একজন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড-প্রাপ্ত হামজাকে আন্ডারকভার এজেন্ট করে পাকিস্তানে পাঠাচ্ছেন। ‘শোলে’তে ঠাকুর ডেকে এনেছিলেন জেল-খাটা দুই দুষ্কৃতি জয় আর বিরুকে।
‘শোলে’ শেষ হয়েছিল গব্বরের বিনাশে। ‘ধুরন্ধর’-এর সমাপ্তি রেহমান ডাকাইতের মৃত্যুতেই। এই মৃত্যু যেন কেবল একটি চরিত্রের পরিণতি নয়, বরং একটি যুগের অবসান। এটাও ‘শোলে’-র খুব চেনা পথ। আদিত্য ধর এখানেও সেই একই নৈতিক কাঠামো অনুসরণ করেছেন। ফলে শেষটা নতুন কোনও ধাক্কা দেয় না, বরং আগে থেকেই জানা এক পরিণতির দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।
এখানে প্রশ্ন ওঠে—অনুপ্রেরণা আর নকলের সীমারেখা কোথায়? ‘শোলে’ ভারতীয় সিনেমার এমন এক মাইলফলক, যাকে অস্বীকার করা অসম্ভব। তার প্রভাব থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু ‘ধুরন্ধর’-এ সেই প্রভাব এতটাই নগ্ন যে তা নিজস্বতার জায়গা সংকুচিত করে ফেলে। রেহমান ডাকাইত চরিত্রটি আরও গভীর, আরও আলাদা হতে পারত। এ সময়ের সিনেমায় সে এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু গব্বরের ছায়া এত ঘন যে রেহমান নিজের আলোয় দাঁড়ানোর সুযোগই পায় না।
ফলে ‘ধুরন্ধর’ দেখতে দেখতে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একদিকে অভিনয়, নির্মাণের দক্ষতা চোখে পড়ে, অন্যদিকে গল্পের পরিচিত কাঠামো বারবার মনে করিয়ে দেয়—এই ভয়, এই মিথ, এই মৃত্যু আমরা বহু আগেই দেখেছি। গব্বর সিংয়ের পর্দা কাঁপানো উপস্থিতি যেমন ইতিহাস হয়ে গেছে, রেহমান ডাকাইত তেমন ইতিহাস হয়ে উঠতে চায়, কিন্তু পারে না। কারণ সে জন্ম থেকেই অন্য এক কিংবদন্তির ছায়ায় বড় হয়ে ওঠা চরিত্র।
শেষ পর্যন্ত ‘ধুরন্ধর’ হয়তো এক বিনোদনমূলক ছবি, কিন্তু তা একই সঙ্গে বলিউডের মূলধারার সেই চিরাচরিত সমস্যাকেও সামনে আনে—নিরাপদ পথে হাঁটার প্রবণতা। আদিত্য ধর ‘শোলে’-র প্লট প্রায় হবহু অনুসরণ করে এক পরিচিত কাঠামোয় গল্প বলেছেন। ফলে রেহমান ডাকাইত যত ভয়ংকরই হোক, সে আর কখনও গব্বর সিংয়ের মতো অমর হয়ে থাকবে না। সে থেকে যাবে গব্বরের প্রতিবিম্ব হিসেবেই—নিজের পরিচয়ের চেয়ে যার তুলনাই বেশি মনে পড়ে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন