প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত, বাংলাদেশে শোকের ছায়া

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও সংঘাতময় অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত, বাংলাদেশে শোকের ছায়া

উদয় বাংলা ডেস্ক : বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির প্রথম মহিলা সরকারপ্রধান খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৮০। মৃত্যুর সময় পাশে ছিলেন তাঁর ছেলে তারিক রহমান। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোর ৬টায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, “আমাদের প্রিয় জাতীয় নেত্রী আর আমাদের মাঝে নেই। আমরা তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং সবাইকে তার বিদেহী আত্মার জন্য দোয়া করার অনুরোধ জানাই।”
দ্য ডেইলি স্টারের খবরে বলা হয়েছে, গত ২৩ নভেম্বর ফুসফুসে সংক্রমণের উপসর্গ নিয়ে খালেদা জিয়াকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার চিকিৎসকরা জানান, তিনি লিভারের জটিল সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ বুকে ও হৃদ্‌যন্ত্রের নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। দীর্ঘ চিকিৎসা ও শারীরিক জটিলতার পর শেষ পর্যন্ত তার জীবনাবসান ঘটে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও সংঘাতময় অধ্যায়ের অবসান ঘটাল। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ও তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা—যাদের “ব্যাটলিং বেগমস” নামে জানা হতো—দেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করেছেন। শেখ হাসিনা, যিনি গত বছর ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ছাত্র আন্দোলন দমনের ঘটনায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন, বর্তমানে ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক আখ্যা দিয়ে বলেন, জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারাল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও তার মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক জোরদারে খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শাহবাজ শরিফ তাকে পাকিস্তানের একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তার আজীবন সেবার একটি স্থায়ী উত্তরাধিকার রয়ে যাবে।

১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া ১৯৬০ সালে সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং পরে রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ৩৫ বছর বয়সে দুই সন্তানের জননী খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। শুরুতে তাকে রাজনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ মনে করা হলেও সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি নিজেকে একজন শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং সংসদীয় ব্যবস্থা পুনর্বহাল করেন। তার শাসনকাল প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে করা হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগে বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়। তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতা দেশকে বারবার সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। দুর্নীতির অভিযোগ, নির্বাচন বয়কট ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে তার উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক রয়ে গিয়েছে।

২০১৮ সালে একটি দুর্নীতির মামলায় তিনি দণ্ডিত হয়ে কারাবন্দি হন, যদিও পরে অসুস্থতার কারণে তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়। শেখ হাসিনার সরকার তার বিদেশে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার আবেদন নাকচ করেছিল। চলতি বছর সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে ও তার ছেলে তারেক রহমানকে ওই মামলায় খালাস দেয়। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপি সাত দিনের শোক পালনের ঘোষণা করেছে এবং তার জানাজার তারিখ পরে জানানো হবে বলে দলটি জানিয়েছে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন