মহাগঠবন্ধনের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হল তার ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্ক-নির্ভরতা।
পাটনা : শুক্রবার সময় যত গড়িয়েছে ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে আরজেডি-র বিপর্যয়ের করুণ ছবিটা। আর সেই সঙ্গে বোঝা গিয়েছে মহাগঠবন্ধন নানা রাজনৈতিক প্রত্যাশা নিয়ে লড়াই করলেও ভোটদাতার কাছে তার প্রতিশ্রুতি আর তা অনুসরণের দৃশ্যমান পরিকল্পনা পুরোদমে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। পরাজয়ের পেছনের কাঠামোয় শুধু ‘হার’ নেই, বরং বদলেছে রাজনীতির তারকা-সর্বস্বতা, ভোটারের মানসিকতা ও ভোটব্যবহারের ধরণ — এ তিনের মিলনে তৈরি হয়েছে এক নতুন পরিস্থিতি। বিহারবাসী মহাগঠবন্ধনকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, মহাগঠবন্ধনের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হল তার ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্ক-নির্ভরতা, যেখানে দল-ভিত্তিক এবং নিজস্ব সম্প্রদায়ভিত্তিক সমর্থনকে অপরিহার্য মনে করা হয়। কিন্তু এই বিধানসভা নির্বাচনে দেখা গিয়েছে, সময় বদলেছে। আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবের নেতৃত্বে যাই হোক, গত নির্বাচনের মতো সামাজিক-ভিত্তিক একত্রিত কণ্ঠস্বর ভোটদাতাদের কাছে ‘নতুন’ উত্তরে পরিণত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল ‘প্রত্যেক পরিবারে সরকারি চাকরি’, ‘নারী ক্ষমতায়ণ’ ও ‘নতুন জনসুরাজ’-ঁর স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবমুখী বলে ভোটাররা মনে করেননি। একই সঙ্গে, বিশ্লেষকরা বলছেন যে মহাগঠবন্ধনের অপ্রস্তুত প্রচার– গঠন ও অংশীদার গোষ্ঠীর মধ্যে অসমঞ্জস্য তার গঠনমূলক সংকেতকে দুর্বল করেছে। শরিকদের মধ্যে আসন-বণ্টনে সময় নষ্ট হয়েছে, নেতৃত্ব মঞ্চে একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়নি এবং প্রচারে ‘এখনই বদলান’ এর নতুন গল্পটা তুলনায় কম সাড়া ফেলেছে।
তবে শুধু অভ্যন্তরীণ ঘাটতি নয় — রাজনৈতিক পরিবেশও এখন অন্যরকম। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জটিল সামাজিক সমীকরণ: বিশেষ করে ইবিসি (অতি পিছড়ে বর্গ), মহিলা ভোটার, পরিযায়ী শ্রমিক, এমনকি মুসলিম ও অ-যাদব ওবিসি শ্রেণিও। এই পরিবর্তিত পরিমণ্ডলে এনডিও তার একটা ‘বিস্তৃত সামাজিক কোয়ালিশন’ গঠন করে ফেলেছে যা মেধাবি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সামনে থেকে গতি নিয়েছে। মহাগঠবন্ধন যেখান থেকে পিছিয়ে পড়েছে, তা হলো—পরম্পরাগত ভোটব্যাঙ্কের চাপের বাইরে গিয়ে নতুন ভোটদাতার চিন্তা ও নতুন ভোটনির্বাচনের সংযোগ স্থাপনের দিক।
এই প্রসঙ্গে একটি চিত্র দৃষ্টিগোচর হয়েছে: মানুষের কাছে শুধু ‘বিরোধিতা ভোট’ বা ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ নয়—মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমি আগামী পাঁচ বছরে কী পাবো? আমার ঘরে কী পরিবর্তন আসবে? আমার সন্তান কী সুযোগ পাবে? আমার পরিবার নির্দিষ্ট উন্নয়নের রাশ দেখবে কি না? এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে মহাগঠবন্ধন যথেষ্ট দৃঢ় বক্তব্য দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যান্য দিক থেকে দেখলে, প্রচার-মঞ্চে ‘পুরনো রাজনীতি কী দেবে?’–এই সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আরজেডি–এই জোটের কেন্দ্রীয় দল-রূপে যেটি আরও সময় নিয়ে যায়, সেটি বদলে যাওয়ার অভিযোজন একটু দেরিতে করেছে। বেশি সংখ্যক নির্বাচনী প্রচারে দেখা গিয়েছে তথাকথিত ‘জঙ্গলরাজ’-ভিত্তিক আক্রমণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে — যা নতুন ভোটদাতার দৃষ্টিতে বেশি আগ্রাসী, যেন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সর্বোপরি, এই নির্বাচনে মহাগঠবন্ধনের হারে দেখা গিয়েছে যে বিক্ষুব্ধ বা বিরোধী-ভোট শুধু যথেষ্ট ছিল না। ভোটদাতা আজ একাধিক বিকল্প চাইছেন—চিহ্নিত সামাজিক দল বা রঙিন প্রতীক নয়, বাস্তব পরিবর্তনের প্রত্যয় এবং তার দৃষ্টান্ত দেখতে চায়। সেই দৃষ্টান্ত প্রস্তুত করতে গিয়ে না পারায় মহাগঠবন্ধন আজ চাপা পড়ে গিয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—এই পরাজয়ের পর মহাগঠবন্ধন কী করবে? সংগঠন পুনর্গঠন করবে কি না, জন-সম্পৃক্ততার হালনাগাদ নকশা বের করবে কি না, এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—নির্বাচনের পর দৃষ্টান্ত হিসেবে যে কাজ হবে, তা মানুষের ঘরে পৌঁছাবেই কি না? কারণ বিহারের ভোটদান স্পেশাল ধরনের — একদিকে আছে ঐতিহ্য, অন্যদিকে এখন আছে পরিবর্তনের তাগিদ। আর যারা এই পরিবর্তনের দাবিকে ঠিক সময়ে ধরতে পেরেছে, তারা জয়ী হয়েছে।
এই বিশ্লেষণ শুধু একটি নির্বাচন-হারের বিবরণ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সময়ের সূচনা-চিহ্ন। এবারের বিহার ভোট বলছে—“সবাই এক দল হবে, পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন প্রেক্ষাপটে দাঁড়াবে।” মহাগঠবন্ধনের সামনে এখনও সময় রয়েছে সময়, তবে সময় খুব বেশি অপেক্ষা করে না।
![]() |
| রাহুল গান্ধী ও তেজস্বী যাদব। ফাইল ছবি। |
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, মহাগঠবন্ধনের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হল তার ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্ক-নির্ভরতা, যেখানে দল-ভিত্তিক এবং নিজস্ব সম্প্রদায়ভিত্তিক সমর্থনকে অপরিহার্য মনে করা হয়। কিন্তু এই বিধানসভা নির্বাচনে দেখা গিয়েছে, সময় বদলেছে। আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবের নেতৃত্বে যাই হোক, গত নির্বাচনের মতো সামাজিক-ভিত্তিক একত্রিত কণ্ঠস্বর ভোটদাতাদের কাছে ‘নতুন’ উত্তরে পরিণত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল ‘প্রত্যেক পরিবারে সরকারি চাকরি’, ‘নারী ক্ষমতায়ণ’ ও ‘নতুন জনসুরাজ’-ঁর স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবমুখী বলে ভোটাররা মনে করেননি। একই সঙ্গে, বিশ্লেষকরা বলছেন যে মহাগঠবন্ধনের অপ্রস্তুত প্রচার– গঠন ও অংশীদার গোষ্ঠীর মধ্যে অসমঞ্জস্য তার গঠনমূলক সংকেতকে দুর্বল করেছে। শরিকদের মধ্যে আসন-বণ্টনে সময় নষ্ট হয়েছে, নেতৃত্ব মঞ্চে একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়নি এবং প্রচারে ‘এখনই বদলান’ এর নতুন গল্পটা তুলনায় কম সাড়া ফেলেছে।
তবে শুধু অভ্যন্তরীণ ঘাটতি নয় — রাজনৈতিক পরিবেশও এখন অন্যরকম। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জটিল সামাজিক সমীকরণ: বিশেষ করে ইবিসি (অতি পিছড়ে বর্গ), মহিলা ভোটার, পরিযায়ী শ্রমিক, এমনকি মুসলিম ও অ-যাদব ওবিসি শ্রেণিও। এই পরিবর্তিত পরিমণ্ডলে এনডিও তার একটা ‘বিস্তৃত সামাজিক কোয়ালিশন’ গঠন করে ফেলেছে যা মেধাবি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সামনে থেকে গতি নিয়েছে। মহাগঠবন্ধন যেখান থেকে পিছিয়ে পড়েছে, তা হলো—পরম্পরাগত ভোটব্যাঙ্কের চাপের বাইরে গিয়ে নতুন ভোটদাতার চিন্তা ও নতুন ভোটনির্বাচনের সংযোগ স্থাপনের দিক।
এই প্রসঙ্গে একটি চিত্র দৃষ্টিগোচর হয়েছে: মানুষের কাছে শুধু ‘বিরোধিতা ভোট’ বা ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ নয়—মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমি আগামী পাঁচ বছরে কী পাবো? আমার ঘরে কী পরিবর্তন আসবে? আমার সন্তান কী সুযোগ পাবে? আমার পরিবার নির্দিষ্ট উন্নয়নের রাশ দেখবে কি না? এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে মহাগঠবন্ধন যথেষ্ট দৃঢ় বক্তব্য দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যান্য দিক থেকে দেখলে, প্রচার-মঞ্চে ‘পুরনো রাজনীতি কী দেবে?’–এই সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আরজেডি–এই জোটের কেন্দ্রীয় দল-রূপে যেটি আরও সময় নিয়ে যায়, সেটি বদলে যাওয়ার অভিযোজন একটু দেরিতে করেছে। বেশি সংখ্যক নির্বাচনী প্রচারে দেখা গিয়েছে তথাকথিত ‘জঙ্গলরাজ’-ভিত্তিক আক্রমণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে — যা নতুন ভোটদাতার দৃষ্টিতে বেশি আগ্রাসী, যেন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সর্বোপরি, এই নির্বাচনে মহাগঠবন্ধনের হারে দেখা গিয়েছে যে বিক্ষুব্ধ বা বিরোধী-ভোট শুধু যথেষ্ট ছিল না। ভোটদাতা আজ একাধিক বিকল্প চাইছেন—চিহ্নিত সামাজিক দল বা রঙিন প্রতীক নয়, বাস্তব পরিবর্তনের প্রত্যয় এবং তার দৃষ্টান্ত দেখতে চায়। সেই দৃষ্টান্ত প্রস্তুত করতে গিয়ে না পারায় মহাগঠবন্ধন আজ চাপা পড়ে গিয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—এই পরাজয়ের পর মহাগঠবন্ধন কী করবে? সংগঠন পুনর্গঠন করবে কি না, জন-সম্পৃক্ততার হালনাগাদ নকশা বের করবে কি না, এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—নির্বাচনের পর দৃষ্টান্ত হিসেবে যে কাজ হবে, তা মানুষের ঘরে পৌঁছাবেই কি না? কারণ বিহারের ভোটদান স্পেশাল ধরনের — একদিকে আছে ঐতিহ্য, অন্যদিকে এখন আছে পরিবর্তনের তাগিদ। আর যারা এই পরিবর্তনের দাবিকে ঠিক সময়ে ধরতে পেরেছে, তারা জয়ী হয়েছে।
এই বিশ্লেষণ শুধু একটি নির্বাচন-হারের বিবরণ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সময়ের সূচনা-চিহ্ন। এবারের বিহার ভোট বলছে—“সবাই এক দল হবে, পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন প্রেক্ষাপটে দাঁড়াবে।” মহাগঠবন্ধনের সামনে এখনও সময় রয়েছে সময়, তবে সময় খুব বেশি অপেক্ষা করে না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন