বিরোধী ভোটে ভাঙন, লাভ BJP-র: পিকে কি সত্যিই বদলে দিলেন বিহারের নির্বাচনী সমীকরণ?

বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, জন সুরাজ আসলে বিরোধী ভোটের বড় অংশকে বিচ্ছিন্ন করেছে। 

বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, জন সুরাজ আসলে বিরোধী ভোটের বড় অংশকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

পাটনা : বিহার বিধানসভা নির্বাচন ২০২৫-এর ফল প্রকাশের পরেই রাজ্যে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক জ্বলতে শুরু করেছে—বিরোধী ভোটে ভাঙন কি বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা করে দিল? বিশেষ করে প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ দলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। কারণ নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াতেই একাধিক আসনে দেখা গিয়েছে, মহাগঠবন্ধনের শক্তিশালী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব ভোটের সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে। আর সেই তৃতীয় শক্তির মুখ ছিলেন পিকে—যাঁর শক্তিশালী প্রচার, গ্রামভিত্তিক সংগঠন এবং “নতুন রাজনীতি”-র বার্তা বিপুলসংখ্যক তরুণ ও নীরব ভোটারকে আকৃষ্ট করেছিল।

বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, জন সুরাজ আসলে বিরোধী ভোটের বড় অংশকে বিচ্ছিন্ন করেছে। পশ্চিম চাম্পারণ, মুজফ্ফরপুর, দ্বারভাঙ্গা থেকে বেগুসরাই—একাধিক আসনে জন সুরাজের প্রার্থী ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেয়েছে। আর ঠিক সেই আসনগুলিতেই মহাগঠবন্ধনের প্রার্থীরা ন্যূনতম ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটাই FPTP পদ্ধতির বাস্তবতা—যেখানে তিনমুখী লড়াই যত তীব্র হয়, ততই ভোটের ক্ষুদ্র ফারাক ক্ষমতার পাল্লা ঘুরিয়ে দেয়। পিকে’র দলের ভোটের একটি বড় অংশ পূর্বতন RJD–কংগ্রেস ভোটব্যাঙ্ক থেকে এসেছে বলেই দাবি করছেন বিরোধী নেতারা। যদিও জন সুরাজ নেতৃত্বের বক্তব্য, তারা নিজের মতো ভোট পেয়েছে, কাউকে সুবিধা করার জন্য নয়।

তবে বিরোধীদের অভ্যন্তরীণ ভাঙন এবং সমন্বয়ের অভাব যে ইতিমধ্যেই তাদের বিপাকে ফেলেছিল, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই। RJD–কংগ্রেস জোটে আসনবণ্টন নিয়ে অসন্তোষ, একাধিক এলাকায় “বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই”, তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন পরিচালনায় গাফিলতি—সব মিলিয়ে বিরোধী জোট একটি ঐক্যবদ্ধ বিকল্পের চেহারা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ, বিশেষত তরুণ, প্রথমবারের ভোটার এবং রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত শ্রেণি, এই সুযোগেই বিকল্প মুখ হিসেবে পিকে–র বার্তার দিকে ঝুঁকেছে। আর এই ঝোঁক শেষ পর্যন্ত পাল্লা ভারী করেছে বিজেপি–জেডিইউ নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের পক্ষে।

বিজেপি শিবির শুরু থেকেই চেয়েছিল এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ত্রিমুখী হোক। কারণ জোটের ভিতরে নীতীশ কুমারকে সামনে রেখে তারা মহিলা ভোটার, EBC–OBC এবং গ্রামীণ উন্নয়ন-ভিত্তিক প্রচারে ফোকাস করেছিল। ফলত, বিরোধী শিবির যতই সাংগঠনিক দুর্বলতায় জর্জরিত হয়েছে, এনডিএ ততই তাদের সুশৃঙ্খল ভোটব্যাঙ্ক ধরে রেখেছে। নির্বাচনের ফলফলও তাই প্রমাণ করছে—গোঁজামিল, ক্ষুদ্র ব্যবধান, ভোট টানাটানির প্রতিটি ক্ষেত্রে বিরোধী ভোটের বিচ্ছুরণই NDA-র লাভের কারণ হয়েছে।

এখন প্রশ্ন একটাই—রাজনৈতিক কৌশলবিদ হিসেবে খ্যাত প্রশান্ত কিশোর কি সত্যিই “বিজেপিকে সুবিধা করে দিলেন”? বিরোধীরা বলছেন—হ্যাঁ, কারণ তাঁর আগমনেই বিরোধী ভোট ভেঙেছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পিকে কেবল সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন, যা বিরোধী শিবির নিজেরাই তৈরি করে রেখেছিল। বাস্তবিক অর্থে, বিহারের এই ভোট দেখিয়ে দিল, বিরোধী দলগুলো যতদিন না ঐক্যবদ্ধ, সুস্পষ্ট এবং বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তৈরি করতে পারছে, ততদিন তৃতীয় শক্তির উত্থানই ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে থাকবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন