হাই কোর্টে বড় ধাক্কা শুভেন্দুর, রক্ষাকবচ প্রত্যাহার, নতুন তদন্ত করবে সিবিআই ও রাজ্য পুলিশ যৌথভাবে

২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার বেঞ্চ শুভেন্দুকে রক্ষাকবচ দিয়েছিলেন।

হাই কোর্টে বড় ধাক্কা শুভেন্দুর, রক্ষাকবচ প্রত্যাহার, নতুন তদন্ত করবে সিবিআই ও রাজ্য পুলিশ যৌথভাবে

কলকাতা : কলকাতা হাই কোর্টে শুক্রবার বড় ধাক্কা খেলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বিচারপতি জয় সেনগুপ্তের বেঞ্চ ২০২২ সালে শুভেন্দুকে দেওয়া আদালতের রক্ষাকবচ প্রত্যাহার করে নিল। ফলে এবার থেকে তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে রাজ্যের আর আদালতের অনুমতির প্রয়োজন হবে না। তবে একইসঙ্গে আদালত শুভেন্দুর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ১৫টি এফআইআর খারিজ করে দিয়েছে এবং মানিকতলা-সহ পাঁচটি মামলায় রাজ্য ও সিবিআইয়ের যুগ্ম তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠনের নির্দেশ দিয়েছে।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার বেঞ্চ শুভেন্দুকে রক্ষাকবচ দিয়েছিলেন। তখন রাজ্য পুলিশের দায়ের করা ২৬টি এফআইআরে স্থগিতাদেশ জারি হয় এবং বলা হয়েছিল, বিরোধী দলনেতার বিরুদ্ধে নতুন এফআইআর দায়েরের আগে আদালতের অনুমতি নিতে হবে। সেই অন্তর্বর্তী নির্দেশই এদিন প্রত্যাহার করেন বিচারপতি সেনগুপ্ত। তাঁর পর্যবেক্ষণ, “কোনও অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে না।” অর্থাৎ, তিন বছর আগের রক্ষাকবচের মেয়াদ এদিন কার্যত শেষ হয়ে গেল।

বিচারপতি সেনগুপ্তের রায়ে বলা হয়েছে, মানিকতলা-সহ পাঁচটি মামলায় ১২ সদস্যের সিট গঠিত হবে—সিবিআই ও রাজ্য পুলিশের তরফে ছয়জন করে আধিকারিক থাকবেন। এসপি পদমর্যাদার আধিকারিক থাকবেন এই টিমে। এ ছাড়া শুভেন্দুর বিরুদ্ধে নন্দীগ্রাম, তমলুক ও কাঁথি থানায় আরও কয়েকটি মামলা রয়েছে, যেগুলিতে তিনি এখনও রক্ষাকবচের আবেদন করেননি। আদালত জানিয়েছে, প্রয়োজনে তিনি সেই আবেদন করতে পারেন, আদালত তা বিবেচনা করবে।

এই রায় প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কারণ, ছাব্বিশের ভোটের মুখে এই রায় বিরোধী দলনেতাকে যথেষ্ট চাপে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। রাজ্যের পক্ষে এখন শুভেন্দুর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলিতে নতুন করে তদন্ত শুরু করার পথ খুলে গেল। তবে নিজের বিপর্যয় নয়, বরং জয়ই দেখছেন শুভেন্দু। হাওড়ার এক কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এই রায় আমার পক্ষেই গিয়েছে। জেহাদি সরকার আমার বিরুদ্ধে যত মিথ্যা মামলা দিয়েছিল, আদালত সেগুলো স্থগিত করেছে। খুন, হামলা থেকে শুরু করে মিথ্যে অভিযোগে সাজানো মামলাগুলোও খারিজ হয়েছে। এটা আমার কাছে কোনও নেতিবাচক রায় নয়।”

অন্যদিকে তৃণমূলের রাজ‌্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ কটাক্ষ করে বলেন, “যখন রক্ষাকবচ পেয়েছিলেন, তখন এত আনন্দ করছিলেন কেন? এখন তো আবার এফআইআর করা যাবে, তদন্ত হবে।” শুভেন্দুর রক্ষাকবচ প্রত্যাহার প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “এই রায় রাজ্য সরকারের অবস্থানকেই মান্যতা দিল। এতদিন এই রক্ষাকবচের জোরে শুভেন্দু রাজ্যজুড়ে কুৎসা ছড়িয়েছেন, প্ররোচনা দিয়েছেন। এবার থেকে ভাবতে হবে।” তিনি আরও কটাক্ষ করে বলেন, “জোরকা ঝটকা, ধীরে সে লাগে।” সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর প্রশ্ন, “প্রথমে কেন এই রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছিল, সেটাই দেখা দরকার।” আইনজীবী ও তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া, “এখন তদন্তের রাস্তা খুলে গেল। শুভেন্দু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে এবার মামলা হবে, চাকরি দুর্নীতিতে কত টাকা তুলেছিলেন, সব প্রকাশ পাবে।”

সব মিলিয়ে, ২০২২ সালের রক্ষাকবচ প্রত্যাহারের ফলে শুভেন্দুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যে নতুন এক অনিশ্চয়তার দোরগোড়ায় পৌঁছেছে, তা বলাই বাহুল্য। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশে নতুন সিবিআই-রাজ্য যৌথ তদন্ত দল গঠনের সিদ্ধান্ত এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, যার রাজনৈতিক অভিঘাত গভীর হতে চলেছে নির্বাচনের আগে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন