মহারাষ্ট্রে কমপ্রেসড বায়োগ্যাস (CBG) প্রকল্পের প্রসারে মুম্বইয়ে ‘Waste to Wealth – Scaling GOBARdhan’ কর্মশালার আয়োজন করল BPCL। বর্জ্য থেকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মুম্বই : বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন এবং মহারাষ্ট্রে কমপ্রেসড বায়োগ্যাস (CBG) প্রকল্পের প্রসারে বিশেষ উদ্যোগ নিল ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (BPCL)। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক এবং মহারাষ্ট্র সরকারের সহযোগিতায় মুম্বইয়ে ‘Waste to Wealth – Scaling GOBARdhan’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালার আয়োজন করে সংস্থাটি।
কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের প্রতিনিধি, তেল বিপণন সংস্থা, সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন সংস্থা, পুরসভা, কৃষক সংগঠন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সংস্থা এবং CBG প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত শিল্পোদ্যোগীরা এই কর্মশালায় অংশ নেন। মহারাষ্ট্রে জৈব বর্জ্য থেকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, নীতিগত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন এবং নতুন প্রকল্পের প্রসার ত্বরান্বিত করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
কর্মশালার উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন
মহারাষ্ট্রের মুখ্যসচিব রাজেশ আগরওয়াল,
রাজ্যের নগরোন্নয়ন দফতরের অতিরিক্ত
মুখ্যসচিব কে এইচ গোবিন্দ রাজ, কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের ডিরেক্টর
(জিপি) বিকাশ সিং, মন্ত্রকের ডেপুটি সেক্রেটারি (ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন)
যশিকা মেহতা, BPCL-এর চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর সঞ্জয় খান্না, ডিরেক্টর (মার্কেটিং)
শুভঙ্কর সেন এবং ডিরেক্টর (ফিনান্স) ভি আর কে গুপ্ত।
কর্মশালায় স্বাগত ভাষণে BPCL-এর
বায়োফুয়েল বিভাগের চিফ জেনারেল ম্যানেজার ইন্দরজিৎ সিং মহারাষ্ট্রে পুরসভার কঠিন
বর্জ্য এবং চিনি উৎপাদনের উপজাত প্রেসমাড থেকে জ্বালানি তৈরির বিপুল সম্ভাবনার কথা
তুলে ধরেন। ‘গোবরধন’ উদ্যোগের মূল ভাবনা ‘কচরে সে কাঞ্চন’
অর্থাৎ বর্জ্য থেকেই সম্পদ তৈরির উপর
জোর দিয়ে তিনি বলেন, বর্জ্যকে শুধুমাত্র অপসারণের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না।
পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই বর্জ্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে তা কৃষিক্ষেত্রে সহায়ক উপাদান সরবরাহ,
স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং
কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
BPCL-এর চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর সঞ্জয় খান্না বলেন, সাধারণভাবে যে বর্জ্য ফেলে দেওয়া হয়, তার মধ্যেই নতুন সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তরিত করতে সরকারি নীতি, শিল্প সংস্থা এবং বিভিন্ন অংশীদারের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, কৃষিজ অবশিষ্টাংশ, গবাদি পশুর গোবর, প্রেসমাড এবং পুরসভার জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে CBG উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে পরিচ্ছন্ন ও পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি পাওয়া সম্ভব, অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃত্তাকার অর্থনীতি এবং টেকসই কৃষির প্রসার ঘটানো যায়। CBG উৎপাদনের পাশাপাশি যে জৈব সার তৈরি হয়, তা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও সহায়তা করতে পারে।
ফলে কৃষি থেকে জ্বালানি, জ্বালানি থেকে মাটির
পুষ্টি এবং সেখান থেকে আবার কৃষি উৎপাদনের একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা
সম্ভব। তাঁর মতে, বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির এই উদ্যোগের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া
উচিত সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন।
কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক
গ্যাস মন্ত্রকের ডিরেক্টর (জিপি) বিকাশ সিং গোবরধন প্রকল্পের সম্প্রসারণে
কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা, CBG-র বাজার ও নীতিগত কাঠামো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজ্য সরকারের
ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি মহারাষ্ট্র সরকারকে রাজ্যের CBG নীতির সঙ্গে
কেন্দ্রীয় নীতির সামঞ্জস্য তৈরি, প্রকল্পের জন্য জমির ব্যাঙ্ক গঠন এবং জ্বালানি উৎপাদনের উপযোগী
কাঁচামালের বিস্তারিত সমীক্ষা করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, কেন্দ্র ও রাজ্য
সরকার, শিল্প সংস্থা, পুরসভা, কৃষক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে এই
ক্ষেত্রের প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের পথ আরও সহজ হবে।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যসচিব রাজেশ আগরওয়াল
বলেন, কোনও দেশের উন্নয়নের সঙ্গে তার জ্বালানি ব্যবহারের সম্পর্ক
রয়েছে এবং ভারতের উন্নয়নের যাত্রায় মাথাপিছু জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণও
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাঁর বক্তব্য,
কৃষিজ বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে পরিচ্ছন্ন
জ্বালানি উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পুরসভার কঠিন বর্জ্য এবং
কৃষিক্ষেত্রের অবশিষ্টাংশের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে বৈজ্ঞানিক
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার হওয়ার পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি
ব্যবস্থারও উন্নতি ঘটবে।
কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক
গ্যাস মন্ত্রকের ডেপুটি সেক্রেটারি যশিকা মেহতা কলকাতায় আয়োজিত হতে চলা ইন্ডিয়া
এনার্জি উইক ২০২৭-এর বিষয়বস্তু তুলে ধরেন এবং ভারতের জ্বালানি ব্যবস্থায় CBG-র গুরুত্ব ব্যাখ্যা
করেন। পাশাপাশি, BPCL-এর সিআরডিসি দলের পক্ষ থেকে এনরিচড ফারমেন্টেড অর্গানিক
ম্যানিওর (EFOM) নিয়ে একটি বিশেষ আলোচনা হয়। CBG
উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তৈরি এই জৈব সারের
মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করা এবং টেকসই কৃষিকে সহায়তা করার সম্ভাবনা নিয়ে
আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন ও কৃষির স্থায়িত্বের মধ্যে
সংযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এই সারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
কর্মশালায় গোবরধন প্রকল্প, রাজ্যগুলির জন্য
প্রস্তাবিত আদর্শ CBG নীতি এবং ২০২৬-২৭ সালের SASCI
কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়। সেন্টার ফর
হাই টেকনোলজি (CHT) এবং মহারাষ্ট্র সরকারের নগরোন্নয়ন দফতরের প্রতিনিধিরা
সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি নিয়ে বক্তব্য রাখেন। মহারাষ্ট্রে CBG প্রকল্পের
সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কাঁচামালের নিয়মিত জোগান,
উৎপাদিত গ্যাসের নিশ্চিত ক্রয়, স্থিতিশীল
মূল্যব্যবস্থা, দ্রুত অনুমোদন,
অর্থায়ন এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে
তোলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
BPCL জানিয়েছে, CBG ক্ষেত্রের বিকাশে উৎপাদক,
ক্রেতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে
সহায়তাকারী—এই তিন ভূমিকাতেই সংস্থাটি কাজ করতে আগ্রহী। বর্জ্যকে
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ জীবিকার
সুযোগ বাড়ানো এবং টেকসই কৃষিকে উৎসাহিত করাও এই উদ্যোগের লক্ষ্য। কর্মশালার
আলোচনায় উঠে এসেছে, মহারাষ্ট্রে CBG শিল্পের সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার, পুরসভা, কৃষক, সমবায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান
এবং শিল্প সংস্থাগুলির সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এই সমন্বয়ের মাধ্যমেই গোবরধন
প্রকল্পকে আরও বিস্তৃত করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন ও
আর্থসামাজিক উন্নয়নের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে BPCL।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন