ভোটার তালিকা ও SIR নিয়ে ১৪ বার আপত্তি, নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্য?

ভোটার তালিকা, ফর্ম ৬, SIR ও ডেটাবেস নিয়ে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আপত্তি দুই নির্বাচন কমিশনারের। কী বলছে নির্বাচন কমিশন?

নির্বাচন কমিশন, Election Commission of India, ভোটার তালিকা, SIR, Special Intensive Revision, ফর্ম ৬

নয়াদিল্লি : ভোটার তালিকা, ভোটার নিবন্ধন, তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আপত্তি তুলেছেন নির্বাচন কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক তদন্তমূলক প্রতিবেদনে এমনই দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিক ক্ষেত্রে দুই নির্বাচন কমিশনার নথিভুক্ত ভাবে জানিয়েছেন, তাঁদের অবগতি বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই কিছু সিদ্ধান্ত বা যোগাযোগ জারি করা হয়েছে।

এই আপত্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভোটার তালিকায় নতুন ভোটারের নাম তোলার আবেদনপত্র ফর্ম ৬। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রথমবার ভোটার হিসেবে আবেদনকারীদের জন্য ফর্মে একটি নতুন ঘোষণা যুক্ত করা হয়েছিল। সেখানে আবেদনকারীর নিজের নাম অথবা তাঁর বাবা-মা কিংবা দাদা-দিদার নাম ২০০০-এর দশকের গোড়ায় হওয়া শেষ SIR-এর ভোটার তালিকায় ছিল কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। মে মাসে বিবেক যোশী প্রশ্ন তোলেন, সংশ্লিষ্ট নিয়ম সংশোধন না করেই কীভাবে ফর্মে এই পরিবর্তন করা হল। সুখবীর সিং সান্ধুও সেই আপত্তির সঙ্গে সহমত হন। ১৩ অগস্ট সান্ধু ওই পরিবর্তনকে ‘অনুমোদনহীন এবং বেআইনি’ বলে উল্লেখ করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ভোটার তালিকার ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার নিয়েও আপত্তি জানান দুই কমিশনার। বিধানসভা কেন্দ্রভিত্তিক ভোটার তালিকা ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের অধীনে প্রস্তুত হয়। অন্যদিকে ERONet ও ECINet-এর মতো ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটার তালিকার তথ্য পরিচালনা করা হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিবেক যোশী ভোটার তালিকার ডেটাবেস ধীরে ধীরে ‘কেন্দ্রীভূত’ হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট আইনসিদ্ধ কর্তৃপক্ষই যাতে ভোটার তালিকার তথ্য পরিবর্তন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে একটি অডিট করা হোক। পরে রাজ্যস্তরের নির্বাচন আধিকারিকদের কাছ থেকে ERONet-এ পর্যাপ্ত ও সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার না থাকার অভিযোগ নিয়েও সান্ধু উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ রাজ্যে SIR প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই আদালত ও রাজনৈতিক স্তরে বিস্তর আলোচনা চলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩৮ লক্ষ আবেদন ট্রাইব্যুনালগুলিতে বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২২.২১ লক্ষ আবেদন করেছেন এমন ভোটাররা, যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁরা নাম পুনর্বহালের আবেদন করেছেন। অন্যদিকে প্রায় ১৬.১০ লক্ষ আবেদন করা হয়েছে এমন নাম বাদ দেওয়ার জন্য, যেগুলি বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের মাধ্যমে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।

এই দ্বিতীয় ধরনের আবেদন নিয়েই প্রশ্ন তোলেন সান্ধু। নির্বাচন কমিশনের হয়ে ওই আবেদনগুলি করার অনুমোদন কে দিয়েছিল এবং বাস্তবে কে সেগুলি দাখিল করেছিল, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ওই প্রক্রিয়ার ভিত্তি বা পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি, বিবেক যোশী কিংবা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক অবহিত ছিলেন না বলেও সান্ধু জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সফটওয়্যার নিয়েও গোয়ার একটি ঘটনা সামনে এনেছে ওই তদন্ত। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পর ৯৭ জন ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য যোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসাররা। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত সফটওয়্যারে নথিভুক্ত করার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। প্রয়োজনীয় সুবিধা চালু করার জন্য গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে বারবার অনুরোধ করা হলেও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে তা সক্রিয় হয়নি। ফলে ওই ৯৭ জনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা পায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই কমিশনার আপত্তি তুলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো পৃথক যোগাযোগে তাঁরা কাজের বণ্টনে কিছু পরিবর্তনের বিরোধিতা করেন। তাঁদের মতে, এর ফলে ভোটার তালিকার আইটি পরিকাঠামোর উপর নজরদারির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর সরে গিয়েছিল। তাঁদের পূর্বানুমতি বা অবগতি ছাড়াই ওই পরিবর্তন করা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনার পর ৯ সেপ্টেম্বর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার পূর্ণাঙ্গ বৈঠকে বসেন। প্রায় চার মাসের মধ্যে সেটিই ছিল তাঁদের প্রথম এমন বৈঠক বলে তদন্তমূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ঘটনাগুলির পর তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আইনি কাঠামোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালের Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners (Appointment, Conditions of Service and Term of Office) আইনের ১৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যতদূর সম্ভব কমিশনের কাজ সর্বসম্মতভাবে পরিচালনা করার কথা। সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে। কমিশনের কাজের পদ্ধতি এবং দায়িত্ব বণ্টনও সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে।

তবে দুই কমিশনারের আপত্তির ঘটনা কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভাঙন তৈরি করেছে—এমন ধারণা খারিজ করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রতিবেদন প্রকাশের পর কমিশনের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, SIR-সহ কমিশনের সমস্ত সিদ্ধান্তই সর্বসম্মতভাবে এবং দুই নির্বাচন কমিশনার ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অনুমোদন নিয়েই নেওয়া হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, তিন সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ আলোচনার সময় মতপার্থক্য বা পর্যবেক্ষণ থাকা স্বাভাবিক। তাই কোনও বিষয়ে আপত্তি বা ভিন্ন মত প্রকাশের অর্থ এই নয় যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্মিলিত অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া হয়েছে।

ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি পৃথক বিষয়। একদিকে ভোটার তালিকা, ফর্ম ৬, ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার, SIR এবং পশ্চিমবঙ্গে আপিলের প্রক্রিয়া নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের একাধিক লিখিত আপত্তি। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি, SIR-সহ, তিন সদস্যের সম্মতিতেই নেওয়া হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধন, ভোটার নিবন্ধন, ডেটাবেস পরিচালনা এবং আপিলের প্রক্রিয়া নিয়ে নজরদারি চলতে থাকায় এই নথিভুক্ত আপত্তিগুলি দেশের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন