বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজোর কমিটি নিয়ে জট কাটল, বহাল নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত কলকাতা হাই কোর্টের

১০৮ বছরের প্রাচীন বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজোর নতুন কমিটি গঠন নিয়ে দীর্ঘ জটের অবসান। বিচারপতি হিরন্ময় ভট্টাচার্যের নির্দেশে বহাল থাকল নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত, খারিজ আবেদনকারীর মামলা।

বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজোর কমিটি নিয়ে জট কাটল, বহাল নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত কলকাতা হাই কোর্টের

কলকাতা : কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসবের নতুন কমিটি গঠনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের জট কাটল। মঙ্গলবার কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি হিরন্ময় ভট্টাচার্য রায় দিয়ে জানিয়ে দিলেন, যে পদ্ধতিতে বাগবাজারের পুজো কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা সঠিক। একই সঙ্গে বহাল রাখা হয়েছে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত। আবেদনকারী রবিশংকর সেনগুপ্তের আবেদনও এ দিন খারিজ করে দেয় আদালত। ফলে ১০৮ বছরের প্রাচীন এই দুর্গাপুজোর নতুন কমিটি গঠন নিয়ে আইনি জটের অবসান হল বলেই মনে করা হচ্ছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর মামলাটির শুনানি হয়েছিল বিচারপতি হিরন্ময় ভট্টাচার্যের এজলাসে। শুনানি শেষে রায়দান স্থগিত রাখা হয়েছিল। মঙ্গলবার সেই মামলার রায় ঘোষণা করে হাই কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় কোনও ত্রুটি নেই। এর ফলে নিম্ন আদালতের নির্দেশ অনুসারে হওয়া নির্বাচন এবং পরবর্তী প্রক্রিয়াই বৈধ বলে স্বীকৃতি পেল।

নিম্ন আদালতের নির্দেশে গত ৩০ আগস্ট দুই বিশেষ পর্যবেক্ষকের নজরদারিতে বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজোর কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মোট ভোটার ছিলেন ৭৭ জন। তাঁদের মধ্যে ৬৬ জন সদস্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। কিন্তু ভোটের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, সাধারণ সম্পাদক পদে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীই পেয়েছেন সমান ৩৩টি করে ভোট। ঘটনাকে আরও নাটকীয় করে তোলে এই সত্য যে, ওই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী একই পরিবারের দুই ভাই—গৌতম নিয়োগী ও ভাস্কর নিয়োগী। দু’জনের ভোট সমান হওয়ায় কোনও জয়ী নির্ধারণ করা যায়নি এবং কমিটি গঠনকে ঘিরে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়।

শুধু সাধারণ সম্পাদক পদেই নয়, ১২ জন কার্যকরী সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রেও জট দেখা দেয়। চারজন প্রার্থী ৩২টি করে সমান ভোট পাওয়ায় সেখানেও ‘টাই’-এর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। যদিও কোষাধ্যক্ষ পদে প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে যান। এই পরিস্থিতিতে আদালত নিযুক্ত দুই বিশেষ পর্যবেক্ষক সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে নিজেদের মধ্যে বিষয়টির সমাধান করে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক পদে সমান ভোট পাওয়ার জট কীভাবে কাটবে, তা নিয়েই শুরু হয় বিতর্ক।

একপক্ষের দাবি ছিল, এমন পরিস্থিতিতে সভাপতির ‘কাস্টিং ভোট’ বা নির্ণায়ক ভোটের মাধ্যমে জয়ী প্রার্থী নির্ধারণ করা যেতে পারে। অন্যপক্ষ অবশ্য সেই প্রস্তাব মানতে রাজি হয়নি। এরপর বিষয়টি ফের নিম্ন আদালতে গড়ায়। নিম্ন আদালত রায় দিয়ে জানায়, সভাপতি তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেই দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। আদালত নিযুক্ত দুই বিশেষ পর্যবেক্ষকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের গুরুতর অভিযোগও তোলা হয়। পাশাপাশি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে অশান্তি ও ধাক্কাধাক্কার অভিযোগ তুলে এক মহিলা সদস্যও আদালতের দ্বারস্থ হন।

অবশেষে হাই কোর্টের মঙ্গলবারের রায়ে সেই সমস্ত বিতর্কের নিষ্পত্তি হল। বিচারপতি হিরন্ময় ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, যে পদ্ধতিতে পুজো কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা সঠিক এবং নিম্ন আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপের কোনও কারণ নেই।

বাগবাজারের এই দুর্গাপুজোর ইতিহাসও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৯১৯ সালে প্রথম শুরু হয়েছিল এই পুজো। সেই সময় ৫৫ বাগবাজার স্ট্রিটে ‘নেবুবাগান বারোয়ারি দুর্গাপূজা’ নামে পরিচিত ছিল এই আয়োজন। পরবর্তী সময়ে পশুপতি বস লেন এবং বাগবাজার কালীমন্দির সংলগ্ন এলাকাতেও পুজোর আয়োজন করা হয়েছে। পরে স্থায়ীভাবে বাগবাজার এলাকায় পুজোর আয়োজন শুরু হয় এবং ‘বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব’ নামে কমিটি গঠিত হয়। ১৯৩০ সালে দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই পুজোর সভাপতি হন। ১৯৩২ সালে সোসাইটি আইন অনুযায়ী বাগবাজারের এই পুজো কমিটি নথিভুক্ত করা হয়েছিল।

এর আগে ১৯৯৬, ২০০৪, ২০০৬ এবং ২০১০ সালে কমিটির নির্বাচন হয়েছিল। দীর্ঘ ১২ বছর পর ফের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত আদালতের হস্তক্ষেপে মিটল। কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে থাকা বাগবাজার সর্বজনীনের সামনে পুজোর প্রাক্কালে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও এ বার অনেকটাই দূর হল হাই কোর্টের রায়ে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন