গুজরাতের কয়লায় মিলল সূর্যমুখীর মতো বিরল ‘ফুলস গোল্ড’, চমকে দিল ভারতীয় বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার

গুজরাতের লিগনাইট কয়লায় সূর্যমুখীর আকারের বিরল পাইরাইট খনিজের সন্ধান পেলেন ভারতীয় গবেষকরা। এই আবিষ্কার যেমন কোটি বছরের পুরনো সামুদ্রিক পরিবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনই কয়লা দূষণ ও খনি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন সতর্কবার্তাও তুলে ধরছে।

গুজরাতের কয়লায় মিলল সূর্যমুখীর মতো বিরল ‘ফুলস গোল্ড’, চমকে দিল ভারতীয় বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার


উদয় বাংলা ডেস্ক : গুজরাতের কয়লার খনিতে মিলল এক বিরল ও বিস্ময়কর খনিজ গঠন, যা দেখতে অনেকটা সূর্যমুখী ফুলের মতো। বিজ্ঞানীরা এই অতি সূক্ষ্ম খনিজটির পরিচয় দিয়েছেন পাইরাইট বা ‘ফুলস গোল্ড’ হিসেবে। Banaras Hindu University এবং Indian Institute of Technology (Indian School of Mines) Dhanbad-এর গবেষকদের যৌথ সমীক্ষায় এই আবিষ্কার সামনে এসেছে। গবেষকদের দাবি, ভারতে এই ধরনের সূর্যমুখী-আকৃতির পাইরাইটের খোঁজ এই প্রথম মিলল।



গবেষণার জন্য গুজরাতের কচ্ছ অঞ্চলের মাতানোমাধ এবং উমরসার খনি থেকে লিগনাইট কয়লার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেই কয়লাকে গুঁড়ো করে অত্যাধুনিক ফিল্ড-এমিশন স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন বিজ্ঞানীরা। তখনই ধরা পড়ে পাইরাইটের একাধিক অদ্ভুত আকৃতি। বেশিরভাগই ছিল ‘ফ্র্যাম্বয়ডাল’ ধরনের, যা দেখতে অনেকটা ক্ষুদ্র রাস্পবেরির মতো। কিন্তু তার মাঝেই নজরে আসে অত্যন্ত বিরল সূর্যমুখী গঠন। এর কেন্দ্রে ছিল অসংখ্য ক্ষুদ্র স্ফটিকের গুচ্ছ এবং চারদিকে বড় ও সমতল স্ফটিকের স্তর, যা দেখতে অবিকল সূর্যমুখীর বীজ ও পাপড়ির মতো।

গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। একসময় বর্তমান কচ্ছ অঞ্চল ছিল সমুদ্রঘেঁষা জলাভূমি, যেখানে অক্সিজেনের মাত্রা ছিল অত্যন্ত কম। সেই পরিবেশে বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া জৈব পদার্থ ভেঙে হাইড্রোজেন সালফাইড তৈরি করত। পরে সেই গ্যাস জলের লোহার সঙ্গে বিক্রিয়া করে ক্ষুদ্র গোলাকার পাইরাইট স্ফটিক তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে পরিবেশ বদলাতে শুরু করলে ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপ কমে যায় এবং ধীরে ধীরে নতুন স্ফটিক স্তর গড়ে ওঠে। সেই পুনঃস্ফটিকীকরণ প্রক্রিয়ার ফলেই তৈরি হয় সূর্যমুখীর মতো এই বিরল গঠন।

তবে এই আবিষ্কার শুধু ভূতাত্ত্বিক কৌতূহলের বিষয় নয়, পরিবেশ ও খনি নিরাপত্তার দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই পাইরাইট কয়লার ভেতরে এত গভীরে মিশে রয়েছে যে সাধারণ পদ্ধতিতে সালফার আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। ফলে এই কয়লা জ্বালানো হলে বিপুল পরিমাণ সালফার ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ছড়ায়। এই গ্যাসই অ্যাসিড বৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ, যা বনাঞ্চল ধ্বংস, নদী-জল দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এছাড়াও সূক্ষ্ম দানাদার পাইরাইট অত্যন্ত দ্রুত অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কয়লাকে নিজে থেকেই উত্তপ্ত করে তোলে। এর ফলে খনিতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ভূগর্ভস্থ আগুন, খনি বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা শ্রমিক মৃত্যুর মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।



বিজ্ঞানীদের মতে, এই সূর্যমুখী-আকৃতির পাইরাইটের গঠন, আকার ও বিস্তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেলে ভবিষ্যতে কয়লার ব্যবহার আরও নিরাপদ করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে দূষণ নিয়ন্ত্রণের উন্নত প্রযুক্তি তৈরি এবং খনি শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।



Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন