গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর, সর্বত্র বিজেপি: মোদির নেতৃত্বে ভারতের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র

পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে সাফল্যের পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ এখন ২১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ক্ষমতায়। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কীভাবে দেশের ৭২ শতাংশ মানুষের উপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করল বিজেপি, তা নিয়েই লিখছেন দ্বৈপায়ন কর

গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর, সর্বত্র বিজেপি: মোদির নেতৃত্বে ভারতের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র


ভারতের রাজনীতিতে একসময় কংগ্রেসের আধিপত্য ছিল প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের অধিকাংশ রাজ্যেই কংগ্রেসের সরকার ছিল এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী Indira Gandhi-র সময় সেই রাজনৈতিক প্রভাব আরও দৃঢ় হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই জায়গা ক্রমশ দখল করেছে বিজেপি। “গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর, সর্বত্র বিজেপি”—এই বাক্য এখন শুধুই রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং দেশের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে বিজেপির সাংগঠনিক ও নির্বাচনী আধিপত্যের প্রতিফলন।







পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্যের পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন National Democratic Alliance বা এনডিএ এখন দেশের ২১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ক্ষমতায়। সংখ্যাটি নিছক পরিসংখ্যান নয়, এর গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। ২০১৮ সালে এনডিএ যে সর্বোচ্চ বিস্তার অর্জন করেছিল, বর্তমান সংখ্যা সেই রেকর্ডকেই স্পর্শ করেছে। একই সঙ্গে এটি সেই পরিসরকেও ছুঁয়ে ফেলেছে, যা একসময় ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস অর্জন করেছিল।

তবে বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব শুধুমাত্র রাজ্যের সংখ্যায় নয়, জনসংখ্যার নিরিখেও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ বিজেপি ও তার শরিকরা এমন অঞ্চল শাসন করছে, যেখানে দেশের প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষ বাস করেন। ভারতের ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের মধ্যে এই বিপুল অংশের উপর রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করা যে কোনও দলের পক্ষেই ঐতিহাসিক সাফল্য। অথচ মাত্র বারো বছর আগে, ২০১৪ সালে যখন Narendra Modi প্রথমবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন বিজেপির শাসন ছিল মাত্র সাতটি রাজ্যে। সাত থেকে একুশে পৌঁছনোর এই যাত্রাই সমকালীন ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে ধারাবাহিক ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক বিস্তারের গল্প।



বিজেপির এই উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে দলের দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক পরিকল্পনা। শুধুমাত্র নির্বাচনী প্রচার নয়, বুথস্তর পর্যন্ত কর্মী সংগঠন তৈরি, সামাজিক মাধ্যমের আগ্রাসী ব্যবহার, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সরাসরি প্রচার এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক বার্তা—সব মিলিয়ে বিজেপি নিজেদের এমন এক সর্বভারতীয় শক্তিতে পরিণত করেছে, যা ভাষা, অঞ্চল ও সংস্কৃতির সীমা অতিক্রম করতে পেরেছে।

উত্তরাখণ্ডের গঙ্গোত্রী থেকে পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত গঙ্গা অববাহিকা ভারতের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই ভূখণ্ডের বড় অংশেই এখন বিজেপির শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, অসম থেকে বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল—সব জায়গাতেই বিজেপি নিজেদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। ফলে “গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর” স্লোগানটি রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও মিল খুঁজে পাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির সাফল্যের অন্যতম কারণ হল তারা নিজেদের শুধুমাত্র একটি উত্তর বা পশ্চিম ভারতের দল হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি। দক্ষিণ ভারত, পূর্ব ভারত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো বহু বৈচিত্র্যময় অঞ্চলেও দল সংগঠন বিস্তার করেছে। বিশেষ করে পূর্ব ভারতে বিজেপির দ্রুত উত্থান দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য অনেকটাই বদলে দিয়েছে।

একসময় জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস ছিল প্রভাবের একমাত্র কেন্দ্র। এখন সেই জায়গায় বিজেপি নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। তবে বিজেপির বর্তমান শক্তির বিশেষ দিক হল, তারা আঞ্চলিক দলগুলির প্রবল উপস্থিতির মধ্যেও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে। বহু রাজ্যে সরাসরি ক্ষমতায় আসা, কোথাও জোট সরকার পরিচালনা করা এবং কোথাও প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে আসা—সব মিলিয়ে বিজেপি এখন ভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে।



এই বিস্তারের নেপথ্যে নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও বড় ভূমিকা নিয়েছে। উন্নয়ন, পরিকাঠামো, কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তি বিজেপির রাজনৈতিক বার্তাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। সেই কারণেই সাত রাজ্য থেকে ২১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পৌঁছে যাওয়া শুধু নির্বাচনী সাফল্যের গল্প নয়, বরং ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন