প্রোপাগান্ডা ছবি বা শাসকগোষ্ঠীকে তুষ্ট রাখার প্রয়াস বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আর নতুন নয়। বাংলাতেও সেই ধারা ঢুকে পড়ল? লিখছেন শুভব্রত
ছবির গল্প ১৯৯৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মৌসুমী সেনের (ঋতুপর্ণা) সঙ্গে প্রায় ৫০ কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং তার নিখোঁজ হওয়া নিয়ে। সেই সময়ে অনেকেই বলেন, তিনি লন্ডনে পালিয়ে গিয়েছেন! অনেকে ধরে নেন, তিনি গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে হারিয়ে গিয়েছেন। সাংবাদিক অনুপম রায় (অর্পণ) ও তার সহকর্মীর প্রচেষ্টায় ২০ বছর আগে মৌসুমী সেন অন্তর্ধান রহস্যের ফাইল ফের খোলা হয়। ঘটনায় অন্তর্ভুক্ত হয় প্রাক্তন সরকারের প্রভাবশালী নেতা নিলয় বিশ্বাস (সাহেব চট্টোপাধ্যায়), গোয়েন্দা দপ্তরের প্রাক্তন অফিসার রাখহরি গোস্বামী (ব্রাত্য বসু), রাজনীতিবিদ শঙ্কর মল্লিক (কুণাল ঘোষ), মৌসুমীর স্বামী সুখেন সেন (অরিন্দম শীল) এবং আরও অনেকে।
১৯৯৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী পরীক্ষা নিয়ামক মনীষা মুখোপাধ্যায়ের রহস্যজনক অন্তর্ধান আজও অমীমাংসিত। শাসকদলের নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও বিশ্ববিদ্যালয় দুর্নীতির জট থাকায়, তাঁর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে মারাত্মক জল্পনা তৈরি হয়। প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তৎকালীন বাম সরকারকে। নাম উঠে আসে প্রভাবশালী বাম নেতাদের। সেই ঘটনার ছায়ায় তৈরি হয়েছে ‘কর্পূর’। ছবির সরাসরি রাজনৈতিক ইঙ্গিতই ছবিটিকে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে, এই ছবি ভোটের মুখে প্রাক্তন বাম সরকারের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে যে দুর্নীতির অভিযোগ বাম আমলের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে, ‘কর্পূর’ তা দৃশ্যমান করে তুলেছে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এটি একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডা, যা নির্বাচনের ঠিক আগে মুক্তি দিয়ে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
প্রোপাগান্ডা ছবি বা শাসকগোষ্ঠীকে তুষ্ট রাখার প্রয়াস বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আর নতুন নয়। ‘দ্য অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’, ‘এমার্জেন্সি’, ‘দ্য তাসখন্দ ফাইলস’, কিংবা একেবারে হাল আমলের ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’। প্রকাশ না হলেও এটা কারও বুঝতে অসুবিধা হয়নি, কাদের সুবিধা দিতে এই সব ছবি। এবার সে ধরনের ছবির প্রবেশ ঘটল টলিউডে।
কিন্তু প্রশ্ন হল– সিনেমা কি আদৌ মানুষের রাজনৈতিক মানসে প্রভাব ফেলতে পারে কিংবা ভোটবাক্সে কি প্রভাব ফেলে? ইতিহাস বলছে, সিনেমা মানুষের মনোজগতে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হলেও, সরাসরি ভোটের ফল নির্ধারণে তার ভূমিকা সীমিত। তবে, এটি জনমতের একটি আবহ তৈরি করতে পারে, একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারে। বিশেষ করে যখন একটি ছবি সমসাময়িক রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়, তখন তা দর্শকের মধ্যে পুরনো ক্ষতকে উসকে দিতে পারে, অথবা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তিশালী করতে পারে। ‘কর্পূর’ সেই কাজটাই করছে– এটি দর্শককে মনে করিয়ে দিচ্ছে একটি অতীত, যা নিয়ে আজও বিতর্ক থামেনি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিল্পের স্বাধীনতা। একজন নির্মাতা হিসেবে অরিন্দম শীল তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতেই পারেন, এবং সেটি যদি রাজনৈতিকও হয়, তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সেই শিল্পকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। ‘কর্পূর’ সেই সূক্ষ্ম সীমারেখায় দাঁড়িয়ে–যেখানে এটি একদিকে একটি শক্তিশালী সামাজিক বক্তব্য, অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সম্ভাব্য হাতিয়ার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত দর্শকের। তারা কি এটিকে নিছক সিনেমা হিসেবে নেবে, না কি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে গ্রহণ করবে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ‘কর্পূর’ হয়তো ভোটের ফল নির্ধারণ করবে না, কিন্তু এটি যে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে, তা বলাই যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন