ভোটের আগে দুই ঘোষণা মমতার: প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নাকি নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল?

বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার ঠিক আগে ডিএ বকেয়া দেওয়া শুরু ও পুরোহিত-মুয়াজ্জিনদের ভাতা বৃদ্ধি ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নাকি নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল? লিখছেন শুভব্রত

ভোটের আগে দুই ঘোষণা মমতার: প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নাকি নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল?

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার ঠিক আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ‌্যায় যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করলেন– রাজ্য সরকারি কর্মীদের বকেয়া মহার্ঘভাতা (ডিএ) দেওয়া শুরু এবং পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের ভাতা বৃদ্ধি, তা নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে রাজনীতির বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। বরং এই দুই ঘোষণাকে ভোটের আগে এক নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখতে হবে।

নির্বাচনের আগে সরকার নানা কল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। এটাই এখনকার ভারতীয় রাজনীতির সংস্কৃতি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল ‘সময় নির্বাচন’। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার ঠিক আগে এই ঘোষণা হওয়া কাকতালীয় নয়। নির্বাচন কমিশন যখন দিল্লির বিজ্ঞান ভবন থেকে পশ্চিমবঙ্গ সহ চার রাজ্যের ভোটের সূচি ঘোষণা করল, তার এক ঘণ্টা আগেই নবান্ন থেকে এই দুই ঘোষণা এসেছে।

রাজনীতির অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে নির্বাচনী আচরণবিধির সময়সীমা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন, তা বলাই বাহুল্য। ফলে ঘোষণার সময় নির্ধারণ ছিল স্পষ্টভাবে পরিকল্পিত– আইন ভঙ্গ না করে ভোটের আগে বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
রাজ্য সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ ইস্যু গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যের অন্যতম বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক। এই বিষয়টি নিয়ে মামলা পৌঁছেছিল কলকাতা হাই কোর্টে এবং পরে সুপ্রিম কোর্টে। আদালতের রায়ও মূলত কর্মচারীদের দাবির পক্ষে গিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষে শেষ পর্যন্ত ডিএ দেওয়া ছাড়া বিকল্প খুব বেশি ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন হল, ‘কখন দেওয়া হবে’। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, কর্মচারী সংগঠনগুলির চাপ, এমনকি ধর্মঘটের মধ্যেও সরকার কোনও ঘোষণা করেনি। অথচ ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত সামনে এল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর দুটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এক, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত করা এবং দুই, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত সরকারি কর্মচারীদের মানসিকভাবে সন্তুষ্ট রাখা। কারণ, ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল এই কর্মচারীরাই। দ্বিতীয় ঘোষণা, পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি আরও সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণ গত এক দশকে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিরোধী দল, বিশেষত বিজেপি, বারবার অভিযোগ করেছে যে রাজ্যে মুসলিম তোষণের রাজনীতি চলছে। অন্যদিকে তৃণমূলের শক্তিশালী ভোটভিত্তির একটি বড় অংশ মুসলিম সম্প্রদায়। এই পরিস্থিতিতে ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে দুটি বিষয় লক্ষ্যণীয়– এক, মুয়াজ্জিনদের পাশাপাশি পুরোহিতদেরও সমানভাবে ভাতা বৃদ্ধি এবং ঘোষণার ভাষায়– ‘সমস্ত সম্প্রদায় ও ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করা’-র বার্তা। অর্থাৎ একদিকে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ককে ধরে রাখা, অন্যদিকে হিন্দু ভোটারদের মধ্যে সম্ভাব্য অসন্তোষ কমানোর চেষ্টা।

২০২৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে একটি কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে হবে– দীর্ঘ শাসনের ক্লান্তি বা প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া। ২০১১ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই জমেছে নানা অভিযোগ, অসন্তোষ ও বিরোধিতা। এই প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কৌশল স্পষ্ট। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অসন্তোষ প্রশমিত করা, বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং বিরোধীদের অভিযোগের পাল্টা রাজনৈতিক ভাষ‌্য তৈরি করা।

শেষ পর্যন্ত এই দুটি ঘোষণা হয়তো ভোটের ফল নির্ধারণ করবে না। কিন্তু এগুলি ‘একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা’ তৈরি করে। ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রতীকী বার্তার গুরুত্ব অনেক সময় বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাবের থেকেও বেশি। আর সেই বার্তা তৈরির ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই দক্ষ।


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন