গ্যাসের আকাল, শহরে ফিরছে ঘুঁটে-কয়লা-ধোঁয়ার দিন, শঙ্কা দূষণের

রান্নার গ্যাসের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির জেরে শহরের বহু পরিবার আবার ঘুঁটে ও কয়লার চুলায় ফিরছে। কয়লায় ভরসা রাখছে ছোট রেস্তরাঁ, হোম ফুড ডেলিভারিতেও। বাড়ছে কয়লার চাহিদা ও দাম, পাশাপাশি বাড়ছে পরিবেশ দূষণের আশঙ্কাও।

গ্যাসের আকাল, শহরে ফেরছে ঘুঁটে–কয়লা-ধোঁয়ার দিন, শঙ্কা দূষণের
এআই জেনারেটেড ইমেজ।

উদয় বাংলা : রান্নার গ্যাসের সংকট ও লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে শহরের রান্নাঘরে। সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়া এবং অনেক এলাকায় নিয়মিত সরবরাহে সমস্যা তৈরি হওয়ায় কলকাতা ও শহরতলির বহু পরিবার আবার পুরনো পদ্ধতিতে রান্নার দিকে ঝুঁকছে। অনেক বাড়িতেই দেখা যাচ্ছে কয়লার চুলা বা ঘুঁটে জ্বালিয়ে রান্না করার দৃশ্য, যা কয়েক বছর আগেও শহুরে জীবনে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া, বাণিজ্যিক গ‌্যাসের সংকটে অনেক ছোটো রেস্তরাঁ বা যারা বাড়ি বাড়ি ফুড ডেলিভারি করেন, তাঁরাও ঘঁুটে-কায়লার উনানে ভরসা রাখছেন ব‌্যবসা চালু রাখার জন‌্য।

বাজারে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, হঠাৎ করেই কয়লার চাহিদা বেড়ে গিয়েছে। শহরের বিভিন্ন কয়লার দোকানদারদের দাবি, গত সপ্তাহে বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আগে যেখানে মূলত চায়ের দোকান, ছোট হোটেল বা কিছু কারখানার জন্য কয়লা বিক্রি হত, এখন সাধারণ গৃহস্থরাও কয়লা কিনতে শুরু করেছেন। অনেকেই আবার গ্রামাঞ্চল থেকে ঘুঁটে সংগ্রহ করে আনছেন বা স্থানীয় বাজারে কিনছেন। বিক্রেতাদের কথায়, চাহিদা বাড়ায় কয়লার দামও দ্রুত বাড়ছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে খোলা বাজারে এক কেজি কয়লা ১৮ থেকে ২০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত, এখন তা অনেক জায়গায় ২৫ থেকে ৩০ টাকায় পৌঁছেছে। কিছু এলাকায় আরও বেশি দামও চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।

সরবরাহের দিক থেকেও চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণত কয়লা আসে ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের কয়লাখনি এলাকা থেকে পাইকারি বাজারের মাধ্যমে। কিন্তু হঠাৎ করে খুচরো বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী পর্যাপ্ত মজুত রাখতে পারছেন না। ফলে কিছু দোকানে কয়লার ঘাটতিও দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সীমিত পরিমাণে কয়লা দেওয়া হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কয়লা বা ঘুঁটে ব্যবহারের এই প্রবণতা পরিবেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কয়লা বা শুকনো গোবর পুড়লে প্রচুর ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছড়ায়, যা বায়ুদূষণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকায় এই ধরনের জ্বালানি ব্যবহার বাড়লে বাতাসে পার্টিকুলেট ম্যাটারের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি বা অন্যান্য শ্বাসজনিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে পরিবেশবিদদের আশঙ্কা।

শুধু বাইরের পরিবেশই নয়, বাড়ির ভেতরেও ধোঁয়ার প্রভাব পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রান্নাঘরে যথেষ্ট বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে ধোঁয়া জমে গিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন কয়লা বা ঘুঁটে জ্বালিয়ে রান্না করলে পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

শহরের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যেই এই পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। অনেক আবাসনে বারান্দা বা খোলা জায়গায় ছোট কয়লার উনুন বসিয়ে রান্না করতে দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিকল্প হিসেবে কয়লা বা ঘুঁটে মজুত করে রাখছেন। ফলে একসময় আধুনিক জ্বালানির কারণে প্রায় হারিয়ে যাওয়া কয়লার উনুন আবার শহুরে জীবনে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে, যা একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন আনবে, অন্যদিকে শহরের পরিবেশগত ভারসাম্যেও নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন