ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দশ বছরের বেশি সময় ধরে কোমায় থাকা ৩১ বছরের হরিশ রানার লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছে। দেশে প্রথমবার আদালত অনুমোদিত প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার নজির তৈরি হল।
উদয় বাংলা : ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভেজিটেটিভ অবস্থায় থাকা ৩১ বছরের যুবক হরিশ রানার লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে প্রথমবার আদালতের অনুমোদনে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া বা জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহারের নজির তৈরি হল। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ভারতে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া আইনি স্বীকৃতি পেলেও সক্রিয় ইউথেনেশিয়া এখনও বেআইনি।
২০১৩ সালে একটি দুর্ঘটনায় চণ্ডীগড়ে চতুর্থ তলার ব্যালকনি থেকে পড়ে গুরুতর মাথায় আঘাত পান পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া হরিশ রানা। সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি কোমায় ছিলেন এবং কখনও স্বাভাবিকভাবে চেতনা ফিরে পাননি। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কার্যত ভেজিটেটিভ অবস্থায় ছিলেন। তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস চলছিল ট্র্যাকিওস্টোমি টিউবের মাধ্যমে এবং খাবার দেওয়া হত গ্যাস্ট্রোস্টোমি টিউবের সাহায্যে। পরিবার জানিয়েছে, তিনি কথা বলতে, দেখতে, শুনতে কিংবা কাউকে চিনতে পারতেন না।
এই দীর্ঘ সময় ধরে ছেলের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে পরিবার প্রায় সমস্ত সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা অশোক রানা। বহুবার আদালতের দ্বারস্থ হয়ে তাঁরা ছেলের লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এক বিবৃতিতে অশোক রানা বলেন, আদালতের মানবিক সিদ্ধান্তের জন্য তাঁদের পরিবার কৃতজ্ঞ। তাঁর কথায়, “এটি আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত, কিন্তু আমরা হরিশের ভালোর কথাই ভেবে এই পথ বেছে নিচ্ছি।”
হরিশ রানার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া নিয়ে নতুন করে নৈতিক ও আইনি বিতর্কও শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, কোনও ব্যক্তির নিজের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ‘লিভিং উইল’ কার্যকর হওয়া উচিত। লিভিং উইল হল এমন একটি আইনি নথি যেখানে ১৮ বছরের বেশি বয়সী কোনও ব্যক্তি গুরুতর বা নিরাময়হীন অসুস্থতার ক্ষেত্রে কী ধরনের চিকিৎসা চান বা চান না, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে দিতে পারেন। যেমন, কেউ চাইলে উল্লেখ করতে পারেন যে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে না রাখা হোক বা পর্যাপ্ত ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হোক।
তবে হরিশ রানার ক্ষেত্রে এমন কোনও লিভিং উইল ছিল না। দুর্ঘটনার পর থেকেই তিনি কোমায় থাকায় নিজের সম্মতি দেওয়ারও সুযোগ পাননি। বুধবার সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, তাঁর শরীরে ঘুম-জাগরণের স্বাভাবিক চক্র থাকলেও কোনও অর্থপূর্ণ প্রতিক্রিয়া নেই এবং দৈনন্দিন সমস্ত কাজের জন্য তিনি সম্পূর্ণ অন্যের উপর নির্ভরশীল।
এর আগে ২০২৪ সালে রানার বাবা-মা দিল্লি হাইকোর্টে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয় এই যুক্তিতে যে তিনি লাইফ সাপোর্ট মেশিনে ছিলেন না এবং বাহ্যিক সাহায্য ছাড়াই শ্বাস নিতে পারছিলেন। পরে সুপ্রিম কোর্টেও প্রথমবার তাঁদের আবেদন খারিজ হয়। ২০২৫ সালে আবার নতুন করে আবেদন জানানো হলে আদালত তাঁর শারীরিক অবস্থার মূল্যায়নের জন্য দুটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে।
দুই মেডিক্যাল বোর্ডই জানায়, রানার সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা কার্যত নেই। তাঁকে খাওয়ানো, মূত্র ও মলত্যাগের মতো প্রাথমিক শারীরিক কাজের জন্যও বাহ্যিক সহায়তার প্রয়োজন হয়। রিপোর্টে আরও বলা হয়, তাঁর মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে এবং দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার ফলে গুরুতর বেডসোরও তৈরি হয়েছে।
ভারতের আইনে লিভিং উইল বা প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার ক্ষেত্রে লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের আগে দুটি মেডিক্যাল বোর্ডের সম্মতি বাধ্যতামূলক। সুপ্রিম কোর্টের বুধবারের নির্দেশে সেই চিকিৎসক দলকে রানার চিকিৎসা প্রত্যাহার সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। এই রায়কে অনেকেই ভারতে মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার নিয়ে চলা দীর্ঘ বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন