২০২৬ বিধানসভা ভোটের আগে বড় সিদ্ধান্ত—বাংলায় সিপিএমের সঙ্গে জোট করবে না কংগ্রেস, একাই লড়বে। দিল্লির বৈঠকের পর রাহুল গান্ধী-খাড়গের সিলমোহর, বদলাতে পারে বিরোধী রাজনীতির অঙ্ক।
আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিল কংগ্রেস। সিপিএমের সঙ্গে জোটে না গিয়ে রাজ্যের ২৯৪টি আসনেই একা লড়ার পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। দিল্লিতে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং প্রদেশ নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর এই বার্তা স্পষ্টভাবে সামনে আসে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এবং দলের সাধারণ সম্পাদক তথা বাংলার পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মীর। বৈঠক শেষে মীর জানান, সিপিএমের সঙ্গে জোট করলে দলের কর্মী-সমর্থকদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাই নেতৃত্ব একাই লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
লোকসভা নির্বাচনের পর প্রদেশ কংগ্রেসে নেতৃত্ব বদলের পর থেকেই একা লড়ার ইঙ্গিত মিলছিল। শুভঙ্কর সরকার প্রকাশ্যেই সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়ে সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছিলেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও যে বামেদের সঙ্গে জোটে খুব উৎসাহী নয়, তার ইঙ্গিত মিলেছিল আগেই। গুলাম আহমেদ মীরকে এআইসিসি-তে জোট রাজনীতির অভিজ্ঞ সংগঠক হিসেবেই দেখা হয়, কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে তিনি উল্টো যুক্তি তুলে ধরেছেন—জোটে গেলে কংগ্রেসের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান ঝাপসা হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে জোট নিয়ে কংগ্রেস ও সিপিএমের মধ্যে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধও হয়েছে। সিপিএমের তরফে বারবার দ্রুত সিদ্ধান্তের দাবি তোলা হলেও কংগ্রেস জানায়, তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক প্রক্রিয়া আছে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেই প্রক্রিয়ার ফল হিসেবেই দিল্লির বৈঠকে একা লড়ার সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়েছে।
এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই চাপে পড়েছে সম্ভাব্য বিরোধী জোটের সমীকরণ। ২০২১ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস-বাম-আইএসএফ জোট গড়েছিল। আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকি এখনও কংগ্রেসকে জোটে আসার আহ্বান জানালেও, বাস্তবে কংগ্রেসের এই অবস্থান বিরোধী ঐক্যের সম্ভাবনাকে অনেকটাই দুর্বল করে দিল বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। অন্যদিকে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হলে বৃহত্তর ঐক্য দরকার, এবং তারা নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলতে প্রস্তুত।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেছেন, কংগ্রেস আলাদা দল, তারা নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। কিন্তু ভোটের অঙ্কে বিষয়টি যে তাৎপর্যপূর্ণ, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বিরোধী ভোট যদি একাধিক দলে ছড়িয়ে পড়ে, তার সরাসরি সুবিধা তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে—এমন মত দিচ্ছেন বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
রাজনৈতিক দিক থেকে কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু কৌশলগত’ পদক্ষেপ বলেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। একদিকে দল নিজেদের সংগঠন পুনর্গঠন ও স্বতন্ত্র পরিচয় তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে জোটের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জমি তৈরির চেষ্টা করছে। তবে বাস্তব প্রশ্ন হল, সংগঠনিক শক্তি ও ভোটভিত্তি বর্তমান পরিস্থিতিতে ২৯৪ আসনে একা লড়ার মতো জোরালো কি না।
ভোট যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে বাংলার নির্বাচন শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বিরোধী শিবিরের ভেতরের সমীকরণও বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। কংগ্রেসের একা লড়ার সিদ্ধান্ত সেই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করল, যার প্রভাব পড়তে পারে আসন ভাগ, ভোট কৌশল এবং শেষ পর্যন্ত ফলাফলের অঙ্কেও। এখন দেখার, এই আত্মবিশ্বাসী রাজনৈতিক বাজি কংগ্রেসের পক্ষে কতটা ফলপ্রসূ হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন