লক্ষ্মীর ভান্ডার ও স্বাস্থ্যসাথীর মতো তৃণমূলের ওয়েলফেয়ার প্রকল্প ২০২৬ নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে? রেশন স্ক্যাম, SSC কেলেঙ্কারি ও সন্দেশখালির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েই বিশ্লেষণ। লিখছেন অন্বয়
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে লড়াইটা শুধু বিরোধী বনাম তৃণমূল নয়, বরং 'ওয়েলফেয়ার বনাম অভিযোগ'– এই দ্বৈরথেই আবর্তিত হবে রাজ্যের রাজনীতি। তৃণমূল কংগ্রেস গত এক দশকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছে এক শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে। লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন ভাতা, দুয়ারে সরকার—এই প্রকল্পগুলি সরাসরি ভোটারের ঘরে পৌঁছে গিয়েছে। ফলে প্রশ্নটা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ: তৃণমূলের ওয়েলফেয়ার স্কিম ২০২৬ নির্বাচনে কতটা কাজে লাগবে, আর দুর্নীতির অভিযোগ কতটা ক্ষতি করবে?
গ্রামের অন্দরমহল থেকে শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার—লক্ষ্মীর ভান্ডার বহু মহিলার কাছে কেবল একটি ভাতা নয়, বরং ব্যক্তিগত আর্থিক স্বনির্ভরতার প্রথম স্বাদ। পরিবারের সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামত বাড়ছে, নিজের খরচের জন্য অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে না—এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। একইভাবে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প বহু গরিব ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে বড়সড় চিকিৎসার খরচ থেকে বাঁচিয়েছে। সরকারি হাসপাতাল হোক বা বেসরকারি, কার্ড দেখিয়ে চিকিৎসা পাওয়ার অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের মনে সরাসরি সরকারের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা তৈরি করেছে। ভোটের সময়ে এই স্মৃতি কিন্তু খুব কার্যকর হয়ে ওঠে।
তবে ছবিটা একমুখী নয়। রেশন দুর্নীতি মামলায় একাধিক প্রভাবশালী নেতা গ্রেপ্তার হওয়া, SSC নিয়োগ দুর্নীতিতে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর ক্ষোভ, আর সন্দেশখালি কাণ্ড—এই সব ঘটনাই তৃণমূলের ভাবমূর্তিতে গভীর দাগ কেটেছে। বিশেষ করে SSC কেলেঙ্কারি শুধু আইনি মামলা নয়, এটা একটি প্রজন্মের বেকার শিক্ষিত যুবকদের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। যারা বছরের পর বছর পরীক্ষা দিয়ে, প্রস্তুতি নিয়ে শেষে দেখল টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রি হয়েছে—তাদের ক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী। এই ক্ষোভ সরাসরি ভোটে কতটা রূপ নেবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
রেশন কেলেঙ্কারির প্রভাবও কম নয়। যাদের জন্য সস্তায় বা বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়ার কথা, সেই ব্যবস্থাতেই যদি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে ওয়েলফেয়ার রাজনীতির নৈতিক ভিত্তিটাই নড়ে যায়। বিরোধীরা ঠিক এই জায়গাটাতেই আঘাত করতে চাইছে—বলছে, সরকার টাকা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই টাকার একটা অংশ নাকি মাঝপথেই হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে মানুষের মনে দ্বৈত অনুভূতি তৈরি হচ্ছে: একদিকে প্রকল্পের সুবিধা, অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগ।
সন্দেশখালি ঘটনা আবার অন্য ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, নারীর নিরাপত্তা ও স্থানীয় দাদাগিরির অভিযোগ—যা গ্রামীণ মহিলাদের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। লক্ষ্মীর ভান্ডারের সুবিধাভোগী হয়েও যদি কেউ মনে করেন স্থানীয় স্তরে তাঁরা নিরাপদ নন, তাহলে সেই মানসিক দ্বন্দ্ব ভোটের বাক্সে কীভাবে প্রতিফলিত হবে, তা সহজে আন্দাজ করা যায় না। দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের ঘটনা সরকারের ‘মহিলা-বান্ধব’ ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জ করে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, বাংলার ভোটাররা প্রায়ই ‘লোকাল অভিজ্ঞতা’ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। আমার ঘরে টাকা আসছে কি না, আমার চিকিৎসা হয়েছে কি না, রাস্তা-আলো-জল পাচ্ছি কি না—এই সরাসরি অভিজ্ঞতাগুলি অনেক সময় বড় দুর্নীতির খবরকেও ছাপিয়ে যায়। তৃণমূলের শক্তি এখানেই। তারা প্রকল্পকে শুধু ঘোষণা করেনি, প্রশাসনিক যন্ত্রের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। দুয়ারে সরকার ক্যাম্প, বুথভিত্তিক সংগঠন—সব মিলিয়ে ওয়েলফেয়ারকে তারা এক রাজনৈতিক নেটওয়ার্কে বদলে ফেলেছে।
অন্যদিকে বিরোধীরা চেষ্টা করছে এই বার্তাটা জোরালো করতে যে, ‘আপনার প্রাপ্যটাই আপনাকে দিচ্ছে সরকার, নিজের পকেট থেকে নয়।’ সেই সঙ্গে দুর্নীতির মামলাগুলিকে সামনে রেখে তারা বলতে চাইছে, এই টাকার একটা বড় অংশ নাকি চুরি হয়েছে। ২০২৬-এ ফল নির্ভর করবে কোন বয়ানটা মানুষের মনে বেশি জায়গা করে নেয় তার উপর।
২০২৬-এর লড়াই হবে আবেগ বনাম ক্ষোভের লড়াই। একদিকে সরাসরি পাওয়া আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষার অনুভূতি, অন্যদিকে বঞ্চনা, অন্যায় ও দুর্নীতির ক্ষত। তৃণমূলের ওয়েলফেয়ার স্কিম নিঃসন্দেহে তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ, কিন্তু দুর্নীতির ছায়া যদি আরও ঘন হয়, তাহলে সেই সম্পদের কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে। বাংলার ভোটার শেষ পর্যন্ত কাকে বেশি গুরুত্ব দেবেন—নিজের পাওয়া সুবিধাকে, নাকি সিস্টেমের নৈতিকতাকে—সেই উত্তরই ঠিক করবে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ফল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন