অনলাইনে ‘ইউজড’ অন্তর্বাস বিক্রির রমরমা: ফেটিশ না শোষণ?

অনলাইনে ব্যবহৃত অন্তর্বাস বা ইউজড প্যান্টি বিক্রির বাজার নিয়ে কৌতূহল ও বিতর্ক, দুটোই রয়েছে। ফেটিশ, গোপনীয়তা, নৈতিকতা ও সমাজের প্রভাব কতটা? জানুন এই ট্রেন্ডের সত্যতা। লিখছেন পায়েল।

অনলাইনে ‘ইউজড’ অন্তর্বাস বিক্রির রমরমা: ফেটিশ না শোষণ?

ইন্টারনেট জগতের কোনও কোনও গোপন কোণে একটি অস্বাভাবিক ব্যবসা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে—ব্যবহৃত অন্তর্বাস বা ‘ইউজড প্যান্টি’ অনলাইনে বিক্রি। এই বাজারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার নারী (কিছু ক্ষেত্রে পুরুষও) তাদের ব‌্যবহৃত অন্তর্বাস, মোজা, জিমের পোশাক ইত্যাদি বিক্রি করছেন, আর ক্রেতারা সেগুলো কিনে নিচ্ছেন দেদার দাম দিয়ে। এই প্রবণতা শুধু পশ্চিমী দেশেই সীমাবদ্ধ নয়; দক্ষিণ এশিয়া, এমনকি ভারত-বাংলাদেশের মতো দেশেও এর ছোঁয়া লেগেছে।

এই বাজারের মূল চালিকাশক্তি হলো এক ধরনের যৌন ফেটিশ, যাকে বলা হয় ‘স্মেল ফেটিশ’ বা গন্ধ-সংক্রান্ত আকর্ষণ। অনেক ক্রেতা (প্রধানত পুরুষ) মনে করেন যে ব্যবহৃত অন্তর্বাসে থাকা প্রাকৃতিক গন্ধ, ঘাম বা শরীরের অন্যান্য চিহ্ন যৌন উত্তেজনা বাড়ায়। এছাড়া ট্যাবু বা নিষিদ্ধতার অনুভূতি, কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কাল্পনিক ঘনিষ্ঠতা অনুভব করা—এসবও এই বাজারকে চালিত করে। প্ল্যাটফর্মগুলিতে (যেমন snifffr, Pantydeal, All Things Worn ইত্যাদি) বিক্রেতারা তাদের পণ্যের ছবি, বিবরণ (কতদিন পরা, কী কার্যকলাপের সময় পরা) দিয়ে লিস্টিং করে, আর দাম সাধারণত ২০-৮০ ডলার (প্রায় ১৫০০-৬৫০০ টাকা) থেকে শুরু হয়। কাস্টম অর্ডারে (নির্দিষ্ট দিন পরা, ভিডিও সহ) দাম আরও বেশি হয়।

প্রসঙ্গত, যৌন ফেটিশ (sexual fetishes) হলো এমন যৌন আকর্ষণ যেখানে কোনও নির্দিষ্ট বস্তু, শরীরের অংশ, কার্যকলাপ বা পরিস্থিতি ছাড়া যৌন উত্তেজনা পূর্ণ হয় না বা খুব বেশি বাড়ে। এগুলো মানুষের যৌনতার একটা বৈচিত্র্যময় অংশ, এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ও সম্মতিপূর্ণ হলে কোনও সমস্যা নেই। তবে কিছু ফেটিশ যদি অন্যের ক্ষতি করে বা আইন লঙ্ঘন করে, তাহলে তা ‘প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার’ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

ইউজড প্যান্টি বা স্মেল ফেটিশ ছাড়াও অন্যান্য কিছু সাধারণ এবং কম সাধারণ যৌন ফেটিশ/কিঙ্ক, যা বিভিন্ন গবেষণা, সার্ভে এবং মনোবিজ্ঞানের তথ্য অনুসারে প্রচলিত। এগুলির মধ্যে অনেকগুলিই খুব সাধারণ, এবং মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যায়।

ব‌্যবহৃত অন্তর্বাস বিক্রি এখন অনেকের কাছে ‘সাইড ইনকাম’-এর একটি উপায় হয়ে উঠেছে। কিছু বিক্রেতা দাবি করেন যে তারা মাসে হাজার হাজার ডলার আয় করছেন। প্ল্যাটফর্মগুলো escrow সিস্টেম (নিরাপদ পেমেন্ট) এবং গোপনীয়তা রক্ষার সুবিধা দিয়ে এটিকে আরও সহজ করে তুলেছে। তবে এর পেছনে লুকিয়ে আছে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন।

সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকে এই বাজার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেকে এটিকে নারীর শরীরকে পণ্যায়নের এক চরম রূপ বলে মনে করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে (যেমন মালয়েশিয়া) এ ধরনের অনলাইন বিক্রির খবর প্রকাশ হওয়ায় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা উঠেছে—অনেকে বলেছেন এটি নৈতিকতা ও সমাজের মূল্যবোধের সীমা লঙ্ঘন করে। ভারত বা বাংলাদেশের মতো সমাজে, যেখানে লিঙ্গ-সম্পর্কিত বিষয় এখনও অনেকটা ট্যাবু, এ ধরনের ব্যবসা যদি ছড়িয়ে পড়ে তাহলে সামাজিক চাপ, পারিবারিক সম্মানহানি, এমনকি আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এই ব‌্যবসার আইনি দিকটি এখনও অস্পষ্ট। বেশিরভাগ দেশে ব্যক্তিগত সম্মতিতে এ ধরনের পণ্য বিক্রি অবৈধ নয়, কিন্তু যদি এতে প্রতারণা, চুরি, বা অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠে তাহলে সমস্যা হয়। এছাড়া গোপনীয়তা রক্ষা না করলে ব্ল্যাকমেল, সাইবার অপরাধের ঝুঁকি থাকে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এ ধরনের ফেটিশ থাকা স্বাভাবিক মানুষের যৌনতার এক অংশ হতে পারে, কিন্তু এটিকে বাণিজ্যিকভাবে প্রচার করা বা উৎসাহিত করা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

এই বাজারের উত্থান আমাদের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন তুলে ধরে: ইন্টারনেট কি আমাদের সবচেয়ে গোপন ইচ্ছাগুলোকেও পণ্যে পরিণত করছে? নারীর শরীরের সঙ্গে যুক্ত এ ধরনের ব্যবসা কি সত্যিই ‘স্বাধীনতা’ না কি আরেক ধরনের শোষণ? সমাজ কীভাবে এ ধরনের নিচ প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করবে—নিষিদ্ধ করে না বোঝানোর মাধ্যমে?

এই বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার, কিন্তু সবার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে যে যৌনতা ব্যক্তিগত, কিন্তু তার বাণিজ্যিক রূপ সমাজের সব স্তরে প্রভাব ফেলে। এ ধরনের বাজারের প্রতি কৌতূহল থাকতে পারে, কিন্তু সতর্কতা ও সমালোচনামূলক চিন্তা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।



Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন