যোগাসন কোনও বিলাসিতা নয়, বরং আজকের বাঙালির জন্য প্রয়োজনীয়তা। খাদ্যের আনন্দ আর যোগের শৃঙ্খলার মিশ্রণেই তৈরি হবে সুস্থ, সুন্দর ও অর্থবহ জীবন।
বাঙালি জাতি তার সংস্কৃতির মতোই খাদ্যাভ্যাসে অনন্য। ভাত-মাছের প্রাচুর্য, তরকারির বৈচিত্র্য, মিষ্টির প্রতি অগাধ টান—এসব মিলে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি এক বিশেষ স্বরূপ পেয়েছে। কিন্তু সেই খাদ্যসংস্কৃতি আজকের সময়ে অনেকখানি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে শরীর ও মনের ওপর। ভাত-ডাল-মাছ-মাংসের সঙ্গে ভাজাভুজি আর মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা, আবার অন্যদিকে অফিসকেন্দ্রিক জীবনে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, মানসিক চাপ, রাত জাগা, অগোছালো সময়সূচি—সব মিলে আধুনিক বাঙালির শরীরে নানান সমস্যা দেখা দিচ্ছে। স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাসিডিটি, অনিদ্রা—এসব যেন আজ আর বিশেষ খবরই নয়, বরং প্রায় প্রত্যেক বাড়ির বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে যদি এমন কিছু পাওয়া যায় যা সহজ, স্বাভাবিক, শরীর ও মনের উভয়ের জন্য উপকারী, তবে তা নিঃসন্দেহে অমূল্য হয়ে ওঠে। সেই পথই যোগাসন।
যোগ কেবল ব্যায়াম নয়, এটি শরীর, মন ও আত্মার একত্রীকরণ। ভারতীয় প্রাচীন সাধনাপদ্ধতির এই অঙ্গ আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, আর আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রও এর কার্যকারিতা স্বীকার করেছে। নিয়মিত যোগচর্চা শুধু রোগ প্রতিরোধে নয়, রোগ নিয়ন্ত্রণেও বিশেষভাবে কার্যকর। বাঙালির খাদ্যাভ্যাস যেমন শরীরকে পুষ্ট করে, তেমনই তার বাড়তি দিকগুলিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার শক্তি যোগের মধ্যেই রয়েছে। ভাত-মাছ-মাংস খাওয়ার পর শরীরকে সক্রিয় রাখা দরকার, যাতে বাড়তি ক্যালোরি খরচ হয়, হজম ঠিক থাকে, এবং মেদ জমে না। সেই কাজটিই যোগ দক্ষতার সঙ্গে করে।
ভোরের আলোতে খালি পেটে অল্প সময় যোগচর্চা করলে সারাদিনের ক্লান্তি অনেকটাই কম থাকে। অফিসে বা বাড়িতে যে চাপ আসে, মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়, তা ধ্যান বা প্রণায়ামের মাধ্যমে প্রশমিত হয়। ভুজঙ্গাসন, পশ্চিমোত্তানাসন বা শলভাসনের মতো আসন পেটের সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, হজমশক্তি বাড়ায়। পদ্মাসনে বসে ধ্যান করলে মনের অস্থিরতা কমে, রক্তচাপ স্থিতিশীল হয়। অনুলোম-বিলোম কিংবা ভ্রামরীর মতো প্রণায়াম উদ্বেগ দূর করে মনোসংযোগ বাড়ায়। শবাসনে শরীরকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দেওয়া যায়, ফলে ঘুম স্বাভাবিক হয়। এই কয়েকটি আসনকে যদি দৈনন্দিন অভ্যাসে আনা যায়, তবে আধুনিক বাঙালির অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যায়।
কিন্তু যোগকে কার্যকরী করতে হলে খাদ্যাভ্যাসেও কিছু পরিবর্তন জরুরি। খাওয়া বন্ধ করা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। ভাত-ডাল-মাছ-মাংস থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে বাড়তি সবজি ও ফলমূল থাকা চাই। মিষ্টি খাওয়া কমাতে হবে, ভাজাভাজি এড়াতে হবে। জল পর্যাপ্ত খাওয়া, তেল-মশলা কমানো—এসব ছোট পরিবর্তন শরীরকে সুস্থ রাখবে। এই সামঞ্জস্যের মধ্যে যখন যোগ যুক্ত হয়, তখনই জীবনযাত্রা ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও আজ উদ্বেগের কারণ বেড়েছে। পড়াশোনার প্রতিযোগিতা, চাকরির চাপ, সংসারের দায়িত্ব—এসব মিলে তরুণ থেকে প্রবীণ, সবাই কোনও না কোনওভাবে মানসিক সমস্যায় ভুগছে। ধ্যান এখানে এক অপরিহার্য উপায়। প্রতিদিন কয়েক মিনিট পদ্মাসনে বা সহজ আসনে বসে যদি শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগ দেওয়া যায়, তবে উদ্বেগ অনেকটা কমে যায়। মন শান্ত হয়, মনোসংযোগ বাড়ে।
বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। সাহিত্য, সংগীত, নাটক, সিনেমা—সবকিছুর সঙ্গেই আবেগের সম্পর্ক। সেই আবেগের বহর যখন অস্থিরতা বা উদ্বেগে পরিণত হয়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়। যোগ সেই আবেগকে সৃজনশীলতার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। শরীরের সঙ্গে মনেরও সমান যত্ন নেয়।
বাঙালিরা যে যেমনভাবে সাহিত্য, সংগীত বা আড্ডাকে জীবনের অংশ করেছে, ঠিক তেমনভাবেই যদি যোগকে জীবনযাত্রার অংশ করা যায়, তবে জীবনের গুণগত মান অনেকখানি উন্নত হবে। গঙ্গার ঘাটে ভোরে, কিংবা পার্কে, কিংবা বাড়ির ছাদে—যেখানেই হোক, সামান্য সময়ের জন্য যোগচর্চা করা যায়। এতে শুধু শরীর নয়, মনও হালকা হয়। খাবারের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে যোগ করলে আধুনিক রোগব্যাধি অনেকটাই দূরে থাকে।
বাঙালি জীবনের ছন্দে যোগাসন এক নতুন শক্তি এনে দিতে পারে। ভাত-মাছ-মিষ্টির আনন্দ থাকবে, আবার যোগের শৃঙ্খলাও যুক্ত হবে। শরীর সুস্থ থাকবে, মন শান্ত থাকবে। প্রতিদিন আধঘণ্টা সময় দেওয়া—এটাই যথেষ্ট। এভাবে যোগ বাঙালি জীবনে খাদ্যাভ্যাসকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলবে এবং শরীর-মনকে একসঙ্গে সুস্থ রাখবে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন