পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাড়াতে ব্যাঙ্কগুলিকে ‘ম্যাচমেকার’-এর ভূমিকা নেওয়ার পরামর্শ নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অশোক লাহিড়ীর। সিআইআইয়ের ব্যাঙ্কিং কোলোকিয়ামে পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা।
কলকাতা: শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে ব্যাঙ্কিং পরিষেবাকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিল্প ও বিনিয়োগের প্রসারে ব্যাঙ্কগুলিকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ পশ্চিমবঙ্গ-সহ পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শিল্পসংস্থার সঙ্গে উপযুক্ত আর্থিক সংস্থার যোগাযোগ তৈরি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কগুলিকে ‘ম্যাচমেকার’-এর ভূমিকা নিতে হবে। শুক্রবার কলকাতায় আয়োজিত কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) ১৯তম ব্যাঙ্কিং কোলোকিয়ামে এমনই পরামর্শ দিলেন নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অশোক লাহিড়ী। ‘ব্যাঙ্কিং বিয়ন্ড ক্রেডিট: পাওয়ারিং ইস্টার্ন ইন্ডিয়াজ ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ’ শীর্ষক এই আলোচনাসভায় পূর্ব ভারতের শিল্পায়ন, ঋণের জোগান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়গুলি উঠে আসে।
লাহিড়ীর বক্তব্য, ব্যাঙ্কের কাজ শুধু ঋণ দেওয়া নয়। মানুষের সঞ্চিত অর্থ নিরাপদে রাখার ব্যবস্থাও ব্যাঙ্কিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সুদ পাওয়ার পাশাপাশি অর্থের নিরাপত্তার কথা ভেবেও মানুষ ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখেন। তাঁর মতে, ব্যাঙ্কের আমানত এবং ঋণ দেওয়ার পরিমাণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য থাকে। তার একটি কারণ, আর্থিক ঝুঁকি ও নগদ অর্থের জোগান সামাল দিতে ব্যাঙ্কগুলিকে সরকারি বন্ডের মতো বিভিন্ন আর্থিক উপকরণেও বিনিয়োগ করতে হয়।
দেশের ঋণ ও আমানতের অনুপাতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান জানান, ভারতে ক্রেডিট-টু-ডিপোজিট বা সিডি রেশিও বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ। সেখানে চিনে এই অনুপাত প্রায় ৩৬০ শতাংশ। যদিও এই অনুপাতের জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া কোনও সর্বজনীন নির্দিষ্ট মান বেঁধে দেয়নি। লাহিড়ীর বক্তব্য, ভারতের ক্রেডিট-টু-জিডিপি অনুপাত ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৭৬ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে তা বেড়ে ৮২ শতাংশ হয়েছে। বেসরকারি ক্ষেত্রে ঋণের তুলনামূলক কম জোগানের পিছনে ব্যাঙ্কে আমানতের সীমিত প্রাপ্যতাও একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঋণ ও আমানতের অনুপাতের ফারাক যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে লাহিড়ী জানান, দক্ষিণ ভারতে এই অনুপাত ছিল ৯৩.৬ শতাংশ। পশ্চিম ভারতে ৮২.৮ শতাংশ এবং উত্তর ভারতে ৭৭.৫ শতাংশ। অন্যদিকে, মধ্য ভারতে তা ৫৬.১ শতাংশ, উত্তর-পূর্ব ভারতে ৫০ শতাংশ এবং পূর্ব ভারতে মাত্র ৪৭.৫ শতাংশ। তাঁর মতে, এই পরিসংখ্যান বিভিন্ন অঞ্চলে ঋণের ব্যবহার ও বিনিয়োগের সুযোগের অসম বণ্টনের ইঙ্গিত দেয়। এক অঞ্চলে সংগৃহীত আমানত অন্য অঞ্চলে ঋণ বা বিনিয়োগের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। ব্যবসা করার সুবিধা, শিল্পের পরিবেশ এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির ভূমিকার মতো বিষয়ও আঞ্চলিক ঋণ বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে।
পূর্ব ভারতে ঋণ ও আমানতের অনুপাত কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লাহিড়ী পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর মতে, এ রাজ্যে বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প এবং উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা এর অন্যতম কারণ হতে পারে। জাতীয় আয়ে পশ্চিমবঙ্গের অংশের তুলনায় জনসংখ্যায় রাজ্যের অংশ বেশি। মাথাপিছু আয় প্রায় ২ লক্ষ টাকা, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় কম। শিল্পের আধুনিকীকরণের অভাবও উৎপাদনশীলতা এবং ঋণ গ্রহণের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে বলে তাঁর মত। রাজ্যের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, শিল্পের সম্প্রসারণ এবং আধুনিকীকরণের উপর জোর দেন তিনি।
লাহিড়ীর মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বড় মাপের পরিকাঠামো প্রকল্প গড়ে তোলার পাশাপাশি নতুন শিল্প স্থাপনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বড় পরিকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং শিল্পমহলের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছবে। পাশাপাশি বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণেও জোর দিতে হবে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের চাহিদা বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং রাজ্যের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।
সিআইআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার ডেপুটি চেয়ারম্যান তথা লাক্সমি গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং ওবিট্রির চেয়ারম্যান রুদ্র চট্টোপাধ্যায়ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারের উপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ছোট শিল্পসংস্থাগুলিকে বৃহত্তর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য উপযুক্ত সহায়তা এবং শক্তিশালী শিল্প-পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। সিআইআইয়ের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান তথা টিটাগড় রেল সিস্টেমস লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পৃথীশ চৌধুরী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে প্রথমে রাজ্যের প্রকৃত সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করে কাজে লাগাতে হবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, পশ্চিম ভারতে তফসিলভুক্ত বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির ঋণের পরিমাণ ৬১.৮৯ লক্ষ কোটি টাকা। পূর্ব ভারতে এই পরিমাণ ১৩.৬১ লক্ষ কোটি টাকা। তাঁর প্রশ্ন, উল্লেখযোগ্য সঞ্চয়ের ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে কেন তুলনামূলক কম পুঁজি বিনিয়োগের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে? রাজ্যে বিপুল সংখ্যক নথিভুক্ত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প রয়েছে এবং বেকারত্বের হারও তুলনামূলক কম বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবসম্মত ও ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত প্রকল্পে রূপান্তরিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সিআইআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় ব্যাঙ্কিং কোলোকিয়ামের চেয়ারম্যান তথা বন্ধন গ্রুপের চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখর ঘোষ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় সহায়ক হিসেবে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের উপর চাপ এবং তেলের দামের ওঠানামার মতো নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী রয়েছে। পূর্ব ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্প করিডর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ পরিকাঠামো, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং উৎপাদন শিল্পের সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে পূর্ব ভারতের শিল্পকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার উপরেও জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, প্রযুক্তি ও পুঁজির কার্যকর সমন্বয় এই লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
সিআইআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় আর্থিক পরিষেবা উপসমিতির চেয়ারম্যান তথা সুমেধা ফিসকাল সার্ভিসেস লিমিটেডের ডিরেক্টর বিজয় মুর্মুরিয়া বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দিক থেকে পূর্ব ভারতের যথেষ্ট শক্তি রয়েছে। এই শক্তিকে উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কাজে লাগানোই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে পূর্ব ভারতে পুঁজির প্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সুরে সিআইআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় আর্থিক পরিষেবা উপসমিতির কো-চেয়ারম্যান তথা ইন্ডক্যাপ অ্যাডভাইজর্স প্রাইভেট লিমিটেডের ডিরেক্টর সমীর আগরওয়াল বলেন, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে শুধু ঋণদানের প্রচলিত ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
লাহিড়ীর বক্তব্য, ব্যাঙ্কের কাজ শুধু ঋণ দেওয়া নয়। মানুষের সঞ্চিত অর্থ নিরাপদে রাখার ব্যবস্থাও ব্যাঙ্কিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সুদ পাওয়ার পাশাপাশি অর্থের নিরাপত্তার কথা ভেবেও মানুষ ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখেন। তাঁর মতে, ব্যাঙ্কের আমানত এবং ঋণ দেওয়ার পরিমাণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য থাকে। তার একটি কারণ, আর্থিক ঝুঁকি ও নগদ অর্থের জোগান সামাল দিতে ব্যাঙ্কগুলিকে সরকারি বন্ডের মতো বিভিন্ন আর্থিক উপকরণেও বিনিয়োগ করতে হয়।
দেশের ঋণ ও আমানতের অনুপাতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান জানান, ভারতে ক্রেডিট-টু-ডিপোজিট বা সিডি রেশিও বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ। সেখানে চিনে এই অনুপাত প্রায় ৩৬০ শতাংশ। যদিও এই অনুপাতের জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া কোনও সর্বজনীন নির্দিষ্ট মান বেঁধে দেয়নি। লাহিড়ীর বক্তব্য, ভারতের ক্রেডিট-টু-জিডিপি অনুপাত ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৭৬ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে তা বেড়ে ৮২ শতাংশ হয়েছে। বেসরকারি ক্ষেত্রে ঋণের তুলনামূলক কম জোগানের পিছনে ব্যাঙ্কে আমানতের সীমিত প্রাপ্যতাও একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঋণ ও আমানতের অনুপাতের ফারাক যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে লাহিড়ী জানান, দক্ষিণ ভারতে এই অনুপাত ছিল ৯৩.৬ শতাংশ। পশ্চিম ভারতে ৮২.৮ শতাংশ এবং উত্তর ভারতে ৭৭.৫ শতাংশ। অন্যদিকে, মধ্য ভারতে তা ৫৬.১ শতাংশ, উত্তর-পূর্ব ভারতে ৫০ শতাংশ এবং পূর্ব ভারতে মাত্র ৪৭.৫ শতাংশ। তাঁর মতে, এই পরিসংখ্যান বিভিন্ন অঞ্চলে ঋণের ব্যবহার ও বিনিয়োগের সুযোগের অসম বণ্টনের ইঙ্গিত দেয়। এক অঞ্চলে সংগৃহীত আমানত অন্য অঞ্চলে ঋণ বা বিনিয়োগের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। ব্যবসা করার সুবিধা, শিল্পের পরিবেশ এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির ভূমিকার মতো বিষয়ও আঞ্চলিক ঋণ বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে।
পূর্ব ভারতে ঋণ ও আমানতের অনুপাত কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লাহিড়ী পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর মতে, এ রাজ্যে বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প এবং উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা এর অন্যতম কারণ হতে পারে। জাতীয় আয়ে পশ্চিমবঙ্গের অংশের তুলনায় জনসংখ্যায় রাজ্যের অংশ বেশি। মাথাপিছু আয় প্রায় ২ লক্ষ টাকা, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় কম। শিল্পের আধুনিকীকরণের অভাবও উৎপাদনশীলতা এবং ঋণ গ্রহণের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে বলে তাঁর মত। রাজ্যের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, শিল্পের সম্প্রসারণ এবং আধুনিকীকরণের উপর জোর দেন তিনি।
লাহিড়ীর মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বড় মাপের পরিকাঠামো প্রকল্প গড়ে তোলার পাশাপাশি নতুন শিল্প স্থাপনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বড় পরিকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং শিল্পমহলের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছবে। পাশাপাশি বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণেও জোর দিতে হবে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের চাহিদা বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং রাজ্যের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।
সিআইআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার ডেপুটি চেয়ারম্যান তথা লাক্সমি গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং ওবিট্রির চেয়ারম্যান রুদ্র চট্টোপাধ্যায়ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারের উপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ছোট শিল্পসংস্থাগুলিকে বৃহত্তর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য উপযুক্ত সহায়তা এবং শক্তিশালী শিল্প-পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। সিআইআইয়ের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান তথা টিটাগড় রেল সিস্টেমস লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পৃথীশ চৌধুরী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে প্রথমে রাজ্যের প্রকৃত সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করে কাজে লাগাতে হবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, পশ্চিম ভারতে তফসিলভুক্ত বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির ঋণের পরিমাণ ৬১.৮৯ লক্ষ কোটি টাকা। পূর্ব ভারতে এই পরিমাণ ১৩.৬১ লক্ষ কোটি টাকা। তাঁর প্রশ্ন, উল্লেখযোগ্য সঞ্চয়ের ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে কেন তুলনামূলক কম পুঁজি বিনিয়োগের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে? রাজ্যে বিপুল সংখ্যক নথিভুক্ত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প রয়েছে এবং বেকারত্বের হারও তুলনামূলক কম বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবসম্মত ও ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত প্রকল্পে রূপান্তরিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সিআইআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় ব্যাঙ্কিং কোলোকিয়ামের চেয়ারম্যান তথা বন্ধন গ্রুপের চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখর ঘোষ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় সহায়ক হিসেবে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের উপর চাপ এবং তেলের দামের ওঠানামার মতো নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী রয়েছে। পূর্ব ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্প করিডর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ পরিকাঠামো, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং উৎপাদন শিল্পের সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে পূর্ব ভারতের শিল্পকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার উপরেও জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, প্রযুক্তি ও পুঁজির কার্যকর সমন্বয় এই লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
সিআইআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় আর্থিক পরিষেবা উপসমিতির চেয়ারম্যান তথা সুমেধা ফিসকাল সার্ভিসেস লিমিটেডের ডিরেক্টর বিজয় মুর্মুরিয়া বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দিক থেকে পূর্ব ভারতের যথেষ্ট শক্তি রয়েছে। এই শক্তিকে উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কাজে লাগানোই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে পূর্ব ভারতে পুঁজির প্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সুরে সিআইআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় আর্থিক পরিষেবা উপসমিতির কো-চেয়ারম্যান তথা ইন্ডক্যাপ অ্যাডভাইজর্স প্রাইভেট লিমিটেডের ডিরেক্টর সমীর আগরওয়াল বলেন, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে শুধু ঋণদানের প্রচলিত ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন