পিতৃপক্ষ চলছে! এই সময়ে কী করবেন, কী করবেন না? জানুন কেন মানা হয় এই নিয়মগুলি

পিতৃপক্ষে কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়? তর্পণ, শ্রাদ্ধ, দান, পিণ্ডদান থেকে শুরু করে খাবার ও দৈনন্দিন আচরণের প্রচলিত নিয়ম এবং পিতৃপক্ষের তাৎপর্য জানুন। লিখছেন সঞ্চয়ন

পিতৃপক্ষ চলছে! এই সময়ে কী করবেন, কী করবেন না? জানুন কেন মানা হয় এই নিয়মগুলি
ভাদ্র মাসের পূর্ণিমার পর থেকেই শুরু হয় পিতৃপক্ষ। হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় এই সময়টি প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ, তাঁদের উদ্দেশে তর্পণ, শ্রাদ্ধ এবং দানের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। পিতৃপক্ষের শেষ দিনটি পরিচিত মহালয়া অমাবস্যা নামে। বাংলায় মহালয়ার সঙ্গে দুর্গাপুজোর আবহ জড়িয়ে থাকলেও ধর্মীয় দিক থেকে এই দিনটির অন্যতম গুরুত্ব পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের উদ্দেশে তর্পণ।

পিতৃপক্ষ নিয়ে সমাজে নানা রকম বিশ্বাস ও প্রচলিত নিয়ম রয়েছে। কোথাও বলা হয় এই সময়ে নতুন কিছু শুরু করা উচিত নয়, কোথাও আবার নির্দিষ্ট খাবার এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়। তবে সব নিয়ম সব পরিবার বা সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এক নয়। অঞ্চল, পারিবারিক প্রথা এবং ধর্মীয় মতভেদ অনুযায়ী রীতির পার্থক্য রয়েছে। তাই পিতৃপক্ষের নিয়ম মানার ক্ষেত্রে নিজের পারিবারিক প্রথা ও পুরোহিতের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পিতৃপক্ষে কী করা হয়?

পিতৃপক্ষের মূল উদ্দেশ্য হল প্রয়াত বাবা-মা, দাদা-দিদা, ঠাকুরদা-ঠাকুমা এবং পরিবারের অন্যান্য পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা। প্রচলিত হিন্দু রীতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট তিথিতে তাঁদের উদ্দেশে তর্পণ ও শ্রাদ্ধ করা হয়। অনেক পরিবারে পুরোহিতের পরামর্শ অনুযায়ী পিণ্ডদানও করা হয়।

তর্পণের ক্ষেত্রে সাধারণত জল, তিল ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আচার পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম। এর মধ্যে দিয়ে জীবিত প্রজন্ম তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করে।

কেন তর্পণ ও শ্রাদ্ধ করা হয়?

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে নির্দিষ্ট নিয়মে শ্রাদ্ধ, তর্পণ ও পিণ্ডদান করলে তাঁদের আত্মার শান্তি হয় এবং পরিবারের উপর তাঁদের আশীর্বাদ থাকে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে দেখলে, এই আচারগুলি পরিবারের মৃত সদস্যদের স্মরণ এবং তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি প্রাচীন পদ্ধতি।

বিশেষ করে শ্রাদ্ধের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের একত্রিত হওয়ার একটি সামাজিক দিকও রয়েছে। পূর্বপুরুষদের জীবন, তাঁদের অবদান এবং পারিবারিক ইতিহাসের কথা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

পিতৃপক্ষে দান কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পিতৃপক্ষে অন্ন, বস্ত্র, অর্থ বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করার প্রচলন রয়েছে। অনেকেই দরিদ্র মানুষকে খাবার খাওয়ান বা তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিস দেন। ধর্মীয় বিশ্বাসে দানকে পুণ্যের কাজ হিসেবে দেখা হয় এবং পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে করা দানের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করা হয়।

তবে দানের ক্ষেত্রে লোকদেখানো নয়, সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকার করাকেই গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। খাবার, পোশাক বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী কোনও অভাবী মানুষের হাতে তুলে দেওয়া এই সময়ের মানবিক দিকটিও তুলে ধরে।

পিতৃপক্ষে কী কী করা হয় না?

পিতৃপক্ষ নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত প্রশ্ন হল—এই সময়ে কী কী করা উচিত নয়? প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় অনেকে বিয়ে, গৃহপ্রবেশ, উপনয়ন বা অন্য কোনও বড় মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলেন। কারণ পিতৃপক্ষকে আনন্দ-উৎসবের সময়ের পরিবর্তে পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের উদ্দেশে আচার পালনের সময় হিসেবে দেখা হয়।

অনেক পরিবারে পিতৃপক্ষ চলাকালীন নতুন ব্যবসা শুরু, নতুন বাড়ি কেনা বা বড় কোনও শুভ কাজ শুরু না করার রীতি রয়েছে। তবে এটিও সর্বজনীন ধর্মীয় নিষেধ নয়। বাস্তব প্রয়োজনের ক্ষেত্রে কী করা হবে, তা পরিবার ও স্থানীয় ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী ঠিক করা হয়।

খাবারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা নিয়ম

পিতৃপক্ষের সময় অনেক পরিবার নিরামিষ খাবার গ্রহণ করে। কেউ কেউ পেঁয়াজ, রসুন, আমিষ খাবার বা নির্দিষ্ট কিছু খাদ্য এড়িয়ে চলেন। শ্রাদ্ধের দিন রান্নার ক্ষেত্রেও কিছু বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করা হয়।

এর পিছনে মূলত ধর্মীয় শুচিতা ও সংযমের ধারণা কাজ করে। তবে কোন খাবার গ্রহণ করা যাবে বা যাবে না, তার তালিকা সব পরিবারে এক নয়। তাই কোনও একটি নিয়মকে সব মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

কেন সংযমের কথা বলা হয়?

পিতৃপক্ষের সঙ্গে সংযম, স্মরণ ও আত্মশুদ্ধির ধারণা জড়িয়ে রয়েছে। ধর্মীয় পরম্পরায় এই সময়টিকে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার পাশাপাশি নিজের জীবন, পরিবার এবং দায়িত্বের কথাও ভাবার সময় হিসেবে দেখা হয়।

অতিরিক্ত ভোগবিলাস, আনন্দ-উৎসবের পরিবর্তে কিছুটা সংযত জীবনযাপন করার রীতি তাই বহু পরিবারে দেখা যায়। এর একটি সামাজিক অর্থও রয়েছে—নিজের আনন্দের পাশাপাশি প্রয়াত আপনজনদের কথা স্মরণ করা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

পিতৃপক্ষে চুল-দাড়ি কাটা বা নখ কাটার নিয়ম কি?

কিছু পরিবারে শ্রাদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির জন্য চুল-দাড়ি কাটা, নখ কাটা বা সাজসজ্জা নিয়ে বিশেষ নিয়ম রয়েছে। আবার অনেক পরিবারে এমন কোনও বিধিনিষেধ নেই। তাই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনও নির্দিষ্ট নিয়মকে সর্বজনীন ধর্মীয় বিধান বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

বিশেষ করে শ্রাদ্ধের দিন যাঁরা মূল আচার পালন করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে পারিবারিক পুরোহিত বা ধর্মীয় আচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে নির্দিষ্ট নিয়ম জেনে নেওয়াই ভালো।

পিতৃপক্ষে নতুন কিছু কেন অনেকে শুরু করেন না?

পিতৃপক্ষকে প্রচলিত হিন্দু সংস্কৃতিতে মূলত পূর্বপুরুষদের স্মরণের সময় হিসেবে দেখা হয়। সেই কারণে অনেকে এই সময় বিয়ে, গৃহপ্রবেশ বা নতুন কোনও শুভ অনুষ্ঠান করেন না। এর অর্থ এই নয় যে এই সময়ে কোনও নতুন কাজ করলেই অমঙ্গল হবে—এটি মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারিবারিক রীতির বিষয়।

আধুনিক জীবনে চাকরি, ব্যবসা বা অন্য কোনও জরুরি কাজের সময়সূচি সবসময় ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মেলে না। ফলে এ বিষয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং পারিবারিক রীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পিতৃপক্ষে কী করা ভালো?

পিতৃপক্ষকে শুধু নিষেধের সময় হিসেবে না দেখে স্মরণ ও মানবিকতার সময় হিসেবেও দেখা যায়। পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের কথা মনে করা, তাঁদের জীবনের গল্প পরবর্তী প্রজন্মকে বলা, তাঁদের নামে দরিদ্র মানুষকে খাবার খাওয়ানো, প্রয়োজনীয় জিনিস দান করা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো—এসবের সামাজিক ও মানবিক মূল্য রয়েছে।

যাঁরা ধর্মীয় রীতি পালন করেন, তাঁরা নিজেদের পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী তর্পণ, শ্রাদ্ধ বা পিণ্ডদানের আয়োজন করতে পারেন। আর যাঁরা ধর্মীয় আচার পালন করেন না, তাঁরাও এই সময়টিকে প্রয়াত প্রিয়জনদের স্মরণ করার একটি উপলক্ষ হিসেবে দেখতে পারেন।

পিতৃপক্ষ কি অশুভ সময়?

পিতৃপক্ষকে অশুভ সময় বলা নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণাও রয়েছে। ধর্মীয় পরম্পরায় এই সময়টি মূলত পূর্বপুরুষদের স্মরণ এবং তাঁদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদনের সঙ্গে যুক্ত। তাই একে শুধুমাত্র ‘অশুভ’ বলে ব্যাখ্যা করা যথাযথ নয়।

বরং বলা যায়, পিতৃপক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্মৃতি, কৃতজ্ঞতা, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পরম্পরা। কোন নিয়ম মানবেন আর কোনটি মানবেন না, সেটি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে ব্যক্তির বিশ্বাস, পারিবারিক রীতি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের উপর।

তৃপক্ষের নানা আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে বহু শতাব্দীর ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতি জড়িয়ে রয়েছে। তর্পণ, শ্রাদ্ধ, পিণ্ডদান, দান বা সংযম—প্রতিটি রীতির পিছনে ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে মৃত প্রিয়জনদের স্মরণ এবং তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সামাজিক বার্তা।

তাই পিতৃপক্ষে ‘কী করলে বিপদ হবে’—এই ভয়কে সামনে না রেখে, নিজের পারিবারিক পরম্পরা সম্পর্কে জেনে এবং বিশ্বাস অনুযায়ী আচার পালন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, ধর্মীয় রীতির সঙ্গে যুক্ত বিশ্বাসগুলিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। পিতৃপক্ষ আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা যে পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করছি, তার পিছনে রয়েছে বহু প্রজন্মের মানুষের জীবন ও অবদান।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন