মেদিনীপুরের মাটি থেকে মহাকরণে শুভেন্দু, কাউন্সিলর থেকে বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার উত্থানের গল্প

কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রাম আন্দোলন, তৃণমূলের সংগঠক থেকে বিজেপির মুখ— শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘ রাজনৈতিক সফরের কাহিনি।

মেদিনীপুরের মাটি থেকে মহাকরণে শুভেন্দু, কাউন্সিলর থেকে বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার উত্থানের গল্প


উদয় বাংলা : মেদিনীপুরের মাটি থেকে শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক পথচলা। সেই পথ পেরিয়ে এবার বাংলার মুখ‌্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসতে চলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী— রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই উত্থান নিঃসন্দেহে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা হিসাবে শুক্রবার তাঁর নাম ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার ব্রিগেড ময়দানে বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিতে চলেছেন শুভেন্দু অধিকারী।



ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি শুভেন্দুর। কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে পড়াকালীন কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলে যোগ দেন। কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর হিসাবে রাজনৈতিক কেরিয়ারের শুরু। তারপর চেয়ারম্যান পদে উন্নীত হওয়া। এরপর ধাপে ধাপে বিধায়ক, সাংসদ এবং মন্ত্রী— একের পর এক রাজনৈতিক মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।

২০০৬ সালে কাঁথি দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হন শিশির অধিকারীর পুত্র শুভেন্দু। এরপর ২০০৭-০৮ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন তাঁকে রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। জমি অধিগ্রহণ বিরোধী সেই আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ভরসার মুখ ছিলেন শুভেন্দু। আন্দোলনের সংগঠক হিসাবে তাঁর ভূমিকা তৎকালীন বাম সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই সময় অধিকারী পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব তৃণমূলের শক্তি বাড়িয়েছিল বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।

বিধায়ক হওয়ার পর ২০০৯ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন শুভেন্দু। ২০১৬ সাল পর্যন্ত তৃণমূলের সাংসদ হিসাবে দায়িত্ব সামলানোর পর তিনি রাজ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় পরিবহন, সেচ ও জলসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী করা হয় তাঁকে। সংগঠক হিসাবেও দলের ভিত মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান শুভেন্দু। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো জেলায় তৃণমূলের সংগঠন বিস্তারে তাঁর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।

তবে সময়ের সঙ্গে তৃণমূলের অন্দরে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ২০২০ সালের আগে মতবিরোধের জেরে দল ছাড়েন শুভেন্দু অধিকারী। রাজনৈতিক মহলের বড় অংশের মতে, দলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব বৃদ্ধিই ছিল সেই সংঘাতের অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহযোগী থাকা শুভেন্দু শেষ পর্যন্ত বিজেপিতে যোগ দেন এবং রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় না এলেও নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে জাতীয় রাজনীতিতেও শিরোনামে উঠে আসেন শুভেন্দু। এরপর বিরোধী দলনেতা হিসাবে বিধানসভায় তাঁর আক্রমণাত্মক ভূমিকা বিজেপির সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরেও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি কার্যত বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেন।



এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসন জিতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। সেই জয়ের পরই শুভেন্দু অধিকারীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে রাজ্যের নেতৃত্ব। একসময় যাঁর রাজনৈতিক উত্থান হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছত্রছায়ায়, তিনিই আজ তাঁকে পরাজিত করে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এই পালাবদল তাই শুধু সরকার পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার নাটকীয় পরিণতিও বটে।
/div>

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন